
রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের জোর গুঞ্জন শুরু হয়েছে। সংবিধান অনুযায়ী তাঁর মেয়াদ থাকলেও তাঁকে পদত্যাগ করানো হচ্ছে বলে আলোচনা রয়েছে। শারীরিক অসুস্থতাকে পদত্যাগের কারণ হিসেবে উল্লেখ করার সম্ভাবনা রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল একাধিক সূত্র থেকে জানা গেছে।
সরকার ও বিএনপির সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনকে পদত্যাগের জন্য ইতিমধ্যে বিএনপির উচ্চপর্যায় থেকে বার্তা দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে তাঁর সম্ভাব্য উত্তরসূরি নিয়েও উচ্চপর্যায়ে আলোচনা চলছে।
বঙ্গভবনকেন্দ্রিক একটি সূত্র জানিয়েছে, রাষ্ট্রপতি নিজে তাঁর অধস্তন কর্মীদের শিগগিরই বঙ্গভবন ছেড়ে যাওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন। ওই সূত্রের ভাষ্য, পদত্যাগের পর তিনি কিছুদিন বিশ্রামে থাকবেন। চিকিৎসার জন্য বিদেশেও যেতে পারেন।
পরবর্তী রাষ্ট্রপতি নির্বাচন নিয়েও ক্ষমতাসীন বিএনপির উচ্চপর্যায়ে আলোচনা চলছে। সরকারের গুরুত্বপূর্ণ একটি পদে চুক্তিভিত্তিক দায়িত্বে থাকা একজন সচিবের নাম সম্ভাব্য পরবর্তী রাষ্ট্রপতি হিসেবে হঠাৎ করে আলোচনায় এসেছে। যদিও এর আগে এ পদের জন্য বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতা খন্দকার মোশাররফ হোসেন, আবদুল মঈন খানসহ কয়েকজনের নাম আলোচনায় ছিল।
কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আজজাজিরার অনুসন্ধানী সাংবাদিক জুলকারনাইন সায়ের এক ফেসবুক পোস্টে রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ নিয়ে আলোচনার শুরু করেন। ওই পদে তিনি মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সিনিয়র সচিব ওসমান গনির নাম আলোচনায় রয়েছে বলে জানান। অবসর থেকে তাকে ফিরিয়ে এনেছিল মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। শুরুতে ওসমান গনিকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিবের দায়িত্ব দিয়েছিল ইউনূসের সরকার। নির্বাচনের ঠিক আগে তৎকালীন সরকার তাকে মন্ত্রিপরিষদ সচিব পদে পদায়ন করে।
নির্বাচনের পর তারেক রহমানের বিএনপি সরকার ইউনূসের আমলের অনেক চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বাতিল এবং অনেককে দায়িত্ব থেকে সরালেও ওসমান গনিকে আগের জায়গাতেই রেখে দেয়।
রাষ্ট্রপতি পদে ইউনূস সরকারের আমলে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পাওয়া একজন সচিবের নাম হঠাৎ আলোচনায় আসার বিষয়ে খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘এ বিষয়ে আমি একেবারেই অবগত নই। আর এমন কিছু ঘটলে (রাষ্ট্রপতি পদত্যাগ) শূন্য পদে অনেক নামই আলোচিত হবে, এটাই স্বাভাবিক।’
রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের গুঞ্জন প্রসঙ্গে বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) অর্থ মন্ত্রণালয়ে কক্সবাজারের উন্নয়ন ও পর্যটন নগর হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে অনুষ্ঠিত আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমদ বলেছেন, ‘রাষ্ট্রপতি সাংবিধানিকভাবে পদত্যাগ করতে চাইলে অথবা স্বাস্থ্যগত যেকোনো কারণে তার সেটা অপশন আছে কিন্তু আমরা তো জানি না।’ মন্ত্রী বলছেন, ‘এখানে সরকারের পক্ষ থেকে কিছু বলা যায় না। আপনারা পত্রিকায় দেখেছেন, আমিও শুনেছি। স্বাস্থ্যগত কারণে পদত্যাগ করতে চেয়েছেন সেটা ওনাকে জিজ্ঞেস করতে হবে।’ বিদেশে চিকিৎসা নেওয়ার সময় শেখ হাসিনার সঙ্গে রাষ্ট্রপতির কোনো ফোনালাপ হয়েছিল কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এ বিষয়ে তিনি কিছু জানেন না। তার ভাষ্য, রাষ্ট্রপতি পদত্যাগ করতে চাইলে নিয়ম অনুযায়ী স্পিকারের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দিতে হবে। এরপর সংবিধান অনুযায়ী পরবর্তী প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে।
সংবিধানের ৫০(৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি স্পিকারের উদ্দেশে স্বাক্ষরযুক্ত পত্রের মাধ্যমে পদত্যাগ করতে পারেন। আর ৫৪ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে কিংবা অনুপস্থিতি, অসুস্থতা বা অন্য কোনো কারণে তিনি দায়িত্ব পালনে অসমর্থ হলে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত স্পিকার রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করবেন।
ক্ষমতাসীন দলের নীতিনির্ধারকদের বিবেচনায় রয়েছে, নতুন রাষ্ট্রপতিকে পরবর্তী সংসদ নির্বাচন ঘিরে সম্ভাব্য রাজনৈতিক চাপও সামলাতে হবে। সরকার, বিরোধী দল ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা ও গ্রহণযোগ্যতাও তাই গুরুত্ব পাচ্ছে।
সংবিধানের ১২৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, পদত্যাগ, মৃত্যু বা অপসারণের কারণে রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করতে হয়। সংসদ সদস্যদের ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। ক্ষমতাসীন বিএনপির সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় দলটির মনোনীত ব্যক্তিরই রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার কথা।
চব্বিশের জুলাইয়ের আন্দোলনের মাধ্যমে আগস্টে রাজনৈতিক পট পরিবর্তন হলে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের অপসারণ চেয়েছিলেন ছাত্রনেতারা। তাঁর পদত্যাগের দাবিতে বঙ্গভবন ঘেরাওসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করেছিল জুলাই আন্দোলনকেন্দ্রিক বিভিন্ন সংগঠন।
মো. সাহাবুদ্দিন ২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন। আওয়ামী লীগের মনোনয়নে তিনি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন। তাঁর পাঁচ বছরের মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা ২০২৮ সালের এপ্রিলে।
সম্পাদক ও প্রকাশক : সুহিন আহমদ খান
বার্তা সম্পাদক : বিলাল হোসেন
অফিস : জিন্দাবাজার সিলেট।