বিশেষ প্রতিনিধি
সিলেট অঞ্চলে সম্প্রতি আবদুস সালাম সোবহান নামক এক ইউনিয়ন পরিষদ সদস্যকে ঘিরে নানা অভিযোগ ও বিতর্ক স্থানীয়ভাবে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, জকিগঞ্জ থানার ১ নং বারহাল ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য আবদুস সালাম সোবহান রাজনৈতিক প্রভাব ও প্রশাসনিক নীরবতার সুযোগ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে তিনি এলাকায় প্রভাব বিস্তার অবৈধ কার্যকলাপ করে আসছেন।
এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে অনুসন্ধানে নামে আমাদের প্রতিনিধি দল।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, আবদুস সালাম সোবহান বিগত আওয়ামীলীগ সরকারের সময়ে নিজেকে আওয়াম ীলীগার হিসাবে পরিচয় দিয়ে অপকর্ম করেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যূত হলে তিনি কিছুদিন আত্মগোপনে থাকার পর স্থানীয় দুর্নীতিগ্রস্থ বিএনপি নেতাদের প্রত্যক্ষ মদদে এলাকায় ফিরে আসেন এবং বিএনপির রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন।
তিনি বর্তমানে নিজেকে বিএনপি নেতা হিসাবে পরিচয় দিয়ে আসছেন। এলাকার লোকজন তার অপকর্মের ব্যাপারে স্থানীয় প্রশাসন ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে একাধিক অভিযোগ দিলেও কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।
অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, আবদুস সালাম সোবহান এর বিরুদ্ধে ১ নং বারহাল ইউনিয়ন পরিষদ থেকে অনাস্থা প্রস্তাব প্রেরন করলেও প্রশাসনকে ম্যনেজ করে তিনি এখনো বহাল তবিয়তে আছেন।
স্থানীয় সূত্র ও ভুক্তভোগীদের ভাষ্য অনুযায়ী, সোবহানের বিরুদ্ধে সরকারি জমি দখল, অবৈধ সম্পদ অর্জন, সন্ত্রাসী কার্যকলাপ, মাদক ব্যবসা ও চোরাচালানের মতো নানা অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত রয়েছে। তাদের ভাষ্য, এসব কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে যারাই প্রতিবাদ করেছেন, তাদেরকে হামলা, মামলা কিংবা গুম হওয়ার ঘটনার শিকার হতে হয়েছে।
স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা (যারা নিরাপত্তার স্বার্থে নাম প্রকাশ করতে চাননি) অভিযোগ করেন যে, তার বিরুদ্ধে কেউ প্রতিবাদ করার সাহস পায় না। বিগত সময় এসব কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদ করায় আবদুস সালাম সোবহান গং দ্বারা স্থানীয় সমাজকর্মী ও ডিপ্লোমা প্রকৌশলী আব্দুল্লাহ আল রাজুকে একাধিকবার হামলা ও প্রাণনাশের হুমকির মুখে পড়তে হয়েছিলো।
জানা যায়, সর্বশেষ ২০২৩ সালের জুলাই মাসে আবদুস সালাম সোবহান গং আব্দুল্লাহ আল রাজুকে প্রকাশ্যে হত্যার চেষ্টা করেন। এরপর থেকে তিনি আত্মগোপনে থাকতে বাধ্য হন। একপর্যায়ে আবদুস সালাম সোবহান এর হুমকি ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দ্বারা হয়রানী ও গ্রেফতার আতঙ্কে নিরাপত্তার অভাবে জীবন রক্ষার্থে তিনি দেশ ত্যাগ করে কানাডায় আশ্রয় নেন বলে জানা গেছে।
প্রত্যক্ষদর্শী ও ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যদের অভিযোগ, ২০২৬ সালের ২৫ মার্চ আব্দুল্লাহ আল রাজুর সাথে দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদকারী ও স্থানীয় সমাজকর্মী, কোনাগ্রামের বাসিন্দা মোহাম্মদ জয়নাল উদ্দিন মসজিদ থেকে বাড়ি ফেরার পথে নিখোঁজ হন। নিখোজের দুই দিন পর সোবহানের বাড়ির পাশ থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় সোবহান ও তার অনুসারীদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ উঠলেও যথাযথ তদন্ত হয়নি। পুলিশ ময়না তদন্ত না করে পরিবারকে ভয়ভীতি দেখিয়ে লাশ তড়িঘড়ি করে দাফন করতে বাধ্য করে এবং হার্ট এটাকে মৃত্যু হয়েছে বলে প্রচার করে। তবে এ বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা গেছে, আরেক প্রতিবাদকারী ও বিগত নির্বাচনে ইউপি সদস্য হিসাবে আবদুস সালাম সোবহান এর সাথে প্রতিদ্বন্ধিতাকারী একই গ্রামের হেলাল আহমদকে ২০২৫ সালের ২১ জানুয়ারি নিজ বাড়ি থেকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিচয়ে র্যাব তুলে নেওয়ার পর থেকে তিনি অদ্যাবদি নিখোঁজ রয়েছেন। এখন পর্যন্ত তার কোনো সন্ধান মেলেনি। অনুসন্ধানে আরও উঠে এসেছে, সোবহানের বিরুদ্ধে স্থানীয়ভাবে মাদক কারবার, চুরি ডাকাতি, মারামারি সহ অসংখ্য গুরুতর অভিযোগ থাকলেও কোন বিহিত ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
স্থানীয়দের দাবি, তাঁর রাজনৈতিক প্রভাব এবং প্রশাসনের নিরবতা তাঁকে অপরাধে উৎসাহিত করছে। স্থানীয়দের মতে, রাজনৈতিক প্রভাবের কারণেই তার বিরুদ্ধে ওঠা অনেক অভিযোগ কার্যকর তদন্তের মুখ দেখেনি।
এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে স্থানীয় প্রশাসনের কোনো কর্মকর্তা আনুষ্ঠানিক মন্তব্য করতে রাজি হননি।
আবদুস সালাম সোবহানের বক্তব্য নেওয়ার জন্য একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
এদিকে মানবাধিকারকর্মী ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। পাশাপাশি ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তারা।