স্টাফ রিপোর্টার, সিলেট
সরকার পতনের দীর্ঘ সময় পার হলেও রাজনৈতিক বিরোধ ও প্রতিহিংসার জেরে সিলেটের একটি পরিবারের ওপর আবারও হামলার অভিযোগ উঠেছে। সিলেটের জৈন্তাপুর উপজেলায় এক যুবলীগ নেতার বাড়িতে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। হামলায় গুরুতর আহত হয়েছেন বীর মুক্তিযোদ্ধা রফিক আহমদের স্ত্রী আনোয়ারা বেগম। বর্তমানে তাকে গুরুতর অবস্থায় সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। ঘটনাটি এলাকায় ব্যাপক উত্তেজনা ও আতঙ্কের সৃষ্টি করেছে।
স্থানীয় সূত্র ও পরিবারটির অভিযোগ অনুযায়ী, গতকাল শনিবার ২৭ ডিসেম্বর ২০২৫ইং দুপুর আনুমানিক ১টার দিকে জৈন্তাপুর উপজেলার চৈলাখেল গ্রামে মুক্তিযোদ্ধা রফিক আহমদের বাড়িতে এই হামলার ঘটনা ঘটে। একদল লোক সংঘবদ্ধভাবে বাড়িতে ঢুকে ব্যাপক ভাঙচুর চালায় এবং ঘরের ভেতরে থাকা আসবাবপত্র তছনছ করে। হামলার সময় বাড়িতে থাকা আনোয়ারা বেগম বাধা দেওয়ার চেষ্টা করলে হামলাকারীরা তার ওপর হামলা চালায়।
পরিবার ও স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, হামলাকারীরা ঘরের দরজা-জানালা ভেঙে ফেলে এবং ঘরে থাকা মূল্যবান আসবাবপত্র ভাঙচুর করে। এ সময় তারা স্বর্ণালংকারসহ বিভিন্ন মূল্যবান জিনিসপত্র লুট করে নিয়ে যায় বলেও অভিযোগ করা হয়েছে। আনোয়ারা বেগম চিৎকার শুরু করলে হামলাকারীরা তাকে মারধর করে গুরুতর জখম করে। এতে তিনি মাথাসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে মারাত্মক আঘাতপ্রাপ্ত হন। পরে আশপাশের লোকজন এগিয়ে এসে আহত অবস্থায় তাকে উদ্ধার করে দ্রুত সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করেন।

হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আনোয়ারা বেগম জানান, তিনি দীর্ঘদিন ধরে ক্যান্সারে আক্রান্ত। দুই ছেলের একজন কারাগারে ও অন্যজন পলাতক থাকায় অসুস্থ শরীর নিয়েই তিনি এক নিকটাত্মীয়ের সহায়তায় বাড়িতে বসবাস করছিলেন। পরিবারের সদস্যদের দাবি, তাদের পরিবার দীর্ঘদিন ধরে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত। আনোয়ারা বেগমের বড় ছেলে আতাউর রহমান সেলিম জৈন্তাপুর উপজেলা যুবলীগের সহ-সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত থাকার কারণে স্থানীয় বিএনপি ও জামায়াতের নেতাকর্মীদের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে তাদের বিরোধ চলে আসছে বলে অভিযোগ করেন তারা।
পরিবার সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪ সালে মুক্তিযোদ্ধা কোটায় ছোট ছেলে সাদিকুর রহমান সোহান সিলেট গ্যাসফিল্ডে একটি সরকারি চাকরি লাভ করেন। এরপর থেকেই প্রতিহিংসার বশবর্তী হয়ে স্থানীয় বিএনপি-জামায়াতের নেতাকর্মীরা তাদের পরিবারকে নানাভাবে কটূক্তি ও হুমকি দিয়ে আসছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। এমনকি একাধিকবার সাদিকুর রহমান সোহানের ওপর হামলার ঘটনাও ঘটে বলে পরিবারটি দাবি করেছে। পরে প্রাণনাশের আশঙ্কায় দীর্ঘদিন পলাতক থাকার পর তিনি দেশ ত্যাগ করেন বলে জানা গেছে।
এদিকে বড় ছেলে আতাউর রহমান সেলিম বর্তমানে একটি আলোচিত মামলায় কারাগারে রয়েছেন। জানা গেছে, তিনি এবং তার ছোট ভাই সাদিকুর রহমান সোহান সাংবাদিক ও ছাত্র আবু তাহের মো: তোরাব হত্যা মামলার আসামি হিসেবে অভিযুক্ত। মামলাটি ঘিরেও এলাকায় ব্যাপক আলোচনা রয়েছে।
পরিবারের অভিযোগ, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকে স্থানীয় বিএনপি ও জামায়াতের কিছু নেতাকর্মী তাদের পরিবারকে লক্ষ্য করে বিভিন্নভাবে হয়রানি করে আসছে এবং বাড়িঘর ক্ষতিগ্রস্ত করার চেষ্টা করছে। হামলার দিনও হামলাকারীরা আনোয়ারা বেগমের কাছে তিন লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে। চাঁদা দিতে অস্বীকার করলে তাকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়।
আনোয়ারা বেগম প্রতিবাদ করলে হামলাকারীরা ক্ষিপ্ত হয়ে বাড়িতে হামলা চালায় এবং তাকে গুরুতরভাবে আহত করে বলে অভিযোগ করেছেন পরিবারের সদস্যরা। স্থানীয়দের ধারণা, এই হামলার উদ্দেশ্য শুধু ভাঙচুর নয়, বরং তাকে প্রাণে হত্যার চেষ্টা করা হয়েছিল।
ঘটনার সময় এলাকায় আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি হয়। অনেকেই শব্দ শুনে বাইরে বের হয়ে পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করলেও হামলাকারীদের সংখ্যা বেশি হওয়ায় কেউ সরাসরি প্রতিরোধ করতে সাহস পাননি বলে জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
এদিকে ঘটনার পর স্থানীয় প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। পরিবারটির দাবি, হামলার বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো হলেও এখন পর্যন্ত হামলাকারীদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এ কারণে তারা প্রশাসনের নীরবতা নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেছেন।