আজ শনিবার, ৩১ অক্টোবর, ২০২০

রায়হান হত্যা: পুনঃতদন্ত শুরু করেছে পিবিআই

 প্রকাশিত: ২০২০-১০-১৫ ০৯:৩২:১৪

বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়িতে যুবক রায়হান উদ্দিনকে পিটিয়ে হত্যা মামলার পুনঃতদন্ত শুরু করেছে পুলিশ ব্যুরো ইনভেস্টিগেশন-পিবিআই। গতকাল দুপুর থেকে তারা আলোচিত এ ঘটনার তদন্ত শুরু করে। নিহত রায়হান উদ্দিনের মরদেহ পুনরায় ময়নাতদন্তের জন্য কবর থেকে উত্তোলনের নির্দেশ দিয়েছেন সিলেটের জেলা ম্যাজিস্ট্রেট। আজ-কালের মধ্যে রায়হানের মরদেহ কবর থেকে উত্তোলন করা হতে পারে। গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত পুলিশ এ ঘটনায় কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি। এদিকে পুলিশি হেফাজতে আলোচিত এ হত্যার ঘটনায় ক্ষোভ বিরাজ করছে সিলেটে। গতকালও দিনভর বিভিন্ন সংগঠনের পক্ষ থেকে নানা কর্মসূচি পালন করা হয়েছে। রায়হানের মাকে সান্ত্বনা জানাতে বাড়িতে ছুটে যান রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের নেতারাও।

 

সিলেটের আখালিয়ার নেহারীপাড়ার সাবেক বিজিবি সদস্যের ছেলে রায়হান উদ্দিনকে শনিবার মধ্যরাতে নগরী থেকে ধরে বন্দরবাজার ফাঁড়িতে নিয়ে যায় পুলিশ। ফাঁড়িতেই তার নখ উপড়ে, হাতে ও পায়ে নির্যাতন করে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় রোববার রাতে অজ্ঞাতদের আসামি করে কোতোয়ালি থানায় মামলা করেন নিহতের স্ত্রী তাহমিনা আক্তার তান্নী। মামলার তদন্তে ছিল কোতোয়ালি থানার পুলিশ। গত মঙ্গলবার পুলিশ হেডকোয়ার্টারের এক আদেশে তদন্তভার দেয়া হয় পিবিআইকে। গতকাল সকালে সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের তরফ থেকে পিবিআইয়ের কাছে তদন্তভার হস্তান্তর করা হয়। দায়িত্ব পেয়েই পিবিআই সিলেটের এসপি মো. খালেদুজ্জামান ও ইন্সপেক্টর মহিদুল ইসলামসহ পিবিআইয়ের দল বন্দরবাজার ফাঁড়ির ঘটনাস্থলে যায়। তারা এ সময় ফাঁড়ির ভেতরে যান। কিছু আলামতও সংগ্রহ করেন। প্রায় দুই ঘণ্টা তারা ফাঁড়িতে অবস্থান করেন। পরে তদন্তের ব্যাপারে কথা বলেন, পিবিআইয়ের এসপি মো. খালেদুজ্জামান। তিনি সাংবাদিকদের জানান, ইতিমধ্যে পিবিআইয়ের এ মামলার তদন্তভার গ্রহণ করা হয়েছে। পিবিআই নিরপেক্ষতার সঙ্গে এ মামলার তদন্ত করবে। এবং যেই দোষী সাব্যস্ত হবে তাকে আইনের আওতায় আনা হবে। কাউকে ছাড় দেয়া হবে না। তিনি বলেন, মামলার সাবেক কর্মকর্তা কোতোয়ালি থানার এসআই বাতেন মরদেহের পুনঃতদন্তের জন্য জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে আবেদন জানিয়েছিলেন। বুধবার জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মরদেহ কবর থেকে উত্তোলনের অনুমতি দিয়েছেন। এখন থেকে পিবিআই এই মামলার সবকিছু দেখবে এবং তদন্ত করবে বলে জানান। কোতোয়ালি থানা পুলিশ জানিয়েছে, এসআই বাতেন ছিলেন আলোচিত এ মামলার সাবেক তদন্ত কর্মকর্তা। এসআই বাতেন তদন্তভার গ্রহণের পর ঊর্ধ্বতনদের পরামর্শে রায়হানের মরদেহ কবর থেকে উত্তোলনের অনুমতি চেয়েছিলেন। তার আবেদনের প্রেক্ষিতে জেলা ম্যাজিস্ট্রেট লাশ কবর থেকে উত্তোলনের অনুমতি দিয়েছেন। একই সঙ্গে জেলা ম্যাজিস্ট্রেট সহকারী ম্যাজিস্ট্রেট সুমন আহমদকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। আজ-কালের মধ্যে মরদেহ কবর থেকে উত্তোলন করা হতে পারে বলে জানিয়েছেন মামলার নতুন তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআইয়ের ইন্সপেক্টর মহিদুল ইসলাম। সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের এডিসি (মিডিয়া) জ্যোর্তিময় সরকার জানিয়েছেন, সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই আকবর হোসেন ভূঁইয়াসহ ৪ পুলিশকে সাময়িক বরখাস্ত ও ৩ পুলিশকে প্রত্যাহার করা হয়। সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা চার পুলিশ সদস্য হচ্ছেন- বন্দরবাজার ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই আকবর হোসেন, কনস্টেবল হারুনুর রশিদ, তৌহিদ মিয়া ও টিটু চন্দ্র দাস। প্রত্যাহারকৃত তিন পুলিশ সদস্য হচ্ছেন- এ.এস.আই আশেক এলাহী, এ.এস.আই কুতুব আলী ও কনস্টেবল সজীব হোসেন। তাদের প্রত্যাহারের পর বন্দরবাজার ফাঁড়িতে নতুন করে ৭ পুলিশ সদস্যকে পোস্টিং দেয়া হয়েছে। ফাঁড়ির কার্যক্রমে যাতে কোনো ব্যাঘাত না ঘটে সে ব্যাপারে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। এদিকে রায়হানের মা গতকাল ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘পুলিশ ফাঁড়িতে রায়হানকে নখ উপড়ে, পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। অথচ এখনো আসামি গ্রেপ্তার করা হলো না। এই হত্যার শাস্তি কী শুধু সাসপেন্ড ও প্রত্যাহার করে নেয়া।’ তিনি বলেন- ‘রায়হানকে পুলিশ ছিনতাইকারী সাজিয়ে ঘটনার নাটক সাজাতে চেয়েছিল। কিন্তু যেভাবে তাকে নির্যাতন করা হয়েছে এতে তার পা ও হাত থেঁতলে দেয়া হয়েছে। এভাবে কোনো মানুষ অন্য মানুষকে নির্যাতন করতে পারে না বলে জানান তিনি। তিনি বলেন, রায়হানের তিন মাস বয়সী সন্তান রয়েছে। স্ত্রীও অকালে বিধবা হয়ে গেল। আমি কী পুত্রহত্যা, রায়হানের ছেলে কী তার পিতা হত্যার বিচার চাইতে পারে না।’ তিনি অভিযোগ করে বলেন, ‘রায়হানকে পিটিয়ে খুন করা হলেও পুলিশের উচ্চপদস্থ কোনো কর্মকর্তা বাসায় আসেননি। উল্টো তারা ফোন করে যেতে বলেন। আমি বলেছি, সাংবাদিক নিয়ে যাবো। তখন বলে আর যেতে হবে না। এখনো এ ঘটনায় পুলিশ নাটক করছে বলে জানান তিনি।’ রায়হানের বাড়িতে সমবেদনা জানাতে ছুটে যাচ্ছে রাজনৈতিকসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। গতকাল বিকাল ৪টার দিকে রায়হানের বাড়িতে সমবেদনা জানাতে যান আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও বিসিবির পরিচালক শফিউল আলম চৌধুরী নাদেল। এ সময় তার কাছে নিহতের মা, স্ত্রীসহ অন্যরা ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন। পরে সাংবাদিকদের নাদেল জানান, করোনাকালে আমরা মানবিক পুলিশের দৃষ্টান্ত দেখেছি। কিন্তু রাশেদ সিনহার ঘটনা ও সিলেটের এই ঘটনা জঘন্যতম ঘটনা। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করেছে। সুতরাং যারা দোষী তারা কোনোভাবেই এ ঘটনা থেকে রক্ষা পাবে না। অবশ্যই দোষীদের আইনের আওতায় এনে বিচারের মুখোমুখি করা হবে। এ সময় নাদেলের সঙ্গে কাউন্সিলর মখলিসুর রহমান কামরান, ইলিয়াসুর রহমানসহ দলীয় নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন। এর আগে বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা খন্দকার আবদুল মুক্তাদীরের পক্ষে সিলেট বিএনপি নেতা ও কাউন্সিলর রেজাউল হাসান কয়েস লোদীর নেতৃত্বে দলীয় নেতারা নিহত রায়হানের মাকে সান্ত্ব্তনা দিতে আসেন। তারা এ সময় রায়হান হত্যার বিচার দাবি করেন।

রায়হানের বাড়িতে পিবিআই: ঘটনার পর থেকে পুলিশের কেউ নগরীর নেহারীপাড়াস্থ রায়হানের বাড়িতে যাননি। তবে গতকাল তদন্তভার পেয়ে পিবিআইয়ের কর্মকর্তারা রাতে রায়হানের বাড়ি পরিদর্শন করেছেন। এ সময় তারা রায়হানের পরিবারের সঙ্গে কথা বলেন। এ সময় তারা মামলার বাদি রায়হানের স্ত্রী তাহমিনা আক্তার তান্নীর সঙ্গে কথা বলেন। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা পিবিআই ইন্সপেক্টর মুহিদুল ইসলাম জানিয়েছেন- পিবিআইয়ের একটি টিম রায়হানের বাড়িতে গিয়েছে। ঘটনার তদন্তের জন্য পিবিআইয়ের কর্মকর্তারা যান।  

আপনার মন্তব্য