আজ মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই, ২০২০

শনিবার থেকে লকডাউন নগরীর ১-২৪ ওয়ার্ড

জেলার চূড়ান্ত তালিকা প্রস্তুত হবে আজ

 প্রকাশিত: ২০২০-০৬-১৭ ১৫:৪২:৪২

সিলেট জেলা ও সিটি কর্পোরেশনের কোভিড-১৯ আক্রান্তের অধিক ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা (রেড জোন) শনিবার  থেকে কঠোর লকডাউনের আওতায় আসছে। এর মধ্যে সিলেট সিটি কর্পোরেশনের ২৭টি ওয়ার্ডের মধ্যে ২৪টি ওয়ার্ডকে লকডাউনের আওতায় আনা হচ্ছে। সুরমা নদীর উত্তর পারের ১ থেকে ২৪ নম্বর ওয়ার্ড অর্থাৎ নদীর উত্তর পার পুরোপুরি লকডাউন করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে জেলা কোভিড কমিটি।
তবে, সিলেট জেলার কোনো উপজেলাকেই পুরোপুরি লকডাউন করা হবে না। উপজেলাগুলোতে রেড জোন চিহ্নিত করে নির্দিষ্ট এলাকাকে নতুন লকডাউন নীতিমালার আওতায় নিয়ে আসা হবে।
গতকাল মঙ্গলবার সিলেট সার্কিট হাউসে অনুষ্ঠিত মাল্টিসেক্টরাল কমিটির সভায় এসব নীতিমালা প্রস্তুত করা হয়েছে। আগামীকাল বৃহস্পতিবার থেকে এ নীতিমালা কার্যকর হওয়ার কথা রয়েছে। আজ এসব নীতিমালার দাপ্তরিক অনুমোদন দেবে সিলেটের সিভিল সার্জন কার্যালয়।

সিলেটের ডেপুটি সিভিল সার্জন ডা: নুরে আলম শামীম জানান, গতকাল মঙ্গলবারের সভায় কিছু নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে। আগামীকাল বৃহস্পতিবার ভোর ৬টা থেকে তা কার্যকর হবে। তিনি বলেন, সিলেট নগরীর সুরমা নদীর উত্তর পারের ২৪টি ওয়ার্ড লকডাউনের আওতায় আসবে। অর্থাৎ এপারে ১ থেকে ২৪ নং ওয়ার্ড সবগুলোই রেড জোনের আওতায় থাকছে। আর ওপারে-দক্ষিণ সুরমা এলাকার ২৫ ও ২৬ নম্বর ওয়ার্ড গ্রীণ জোন। ২৭ নম্বর ওয়ার্ডে করোনা রোগী থাকলেও আপাতত দক্ষিণ সুরমা এলাকার ৩ ওয়ার্ডকেই রেড জোনে রাখা হচ্ছে না। তাই এই তিন ওয়ার্ড নতুন নীতিমালার আওতায় থাকছে না। জেলার লকডাউন ও রেড জোনের ব্যাপারে তিনি বলেন, আজ বুধবার জেলার বিষয়টি চূড়ান্ত করা হবে। কোথাও ইউনিয়ন ও কোথাও ওয়ার্ড লকডাউন করা হতে পারে। পুরো উপজেলা লকডাউনের আওতায় নাও আসতে পারে। সেক্ষেত্রে যে এলাকা কিংবা যে বাড়িতে আক্রান্ত বেশি-ওই এলাকা ও বাড়ি সংলগ্ন এলাকা লকডাউন করা হবে।
সিলেট সিটি কর্পোরেশনের একটি সূত্র জানায়, গত ২৮ মে থেকে ১০ জুন পর্যন্ত ১৪ দিনে সিলেট সিটি কর্পোরেশনের করোনা আক্রান্তদের হিসেব করে ২৭ ওয়ার্ডের রেড জোন চিহ্নিত করে সিভিল সার্জন অফিসে প্রেরণ করা হয়। লাখে ১০ জন আক্রান্তের হিসাবে ২৭টি ওয়ার্ডের মধ্যে ১৯টি রেড জোন হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এই জোনিংয়ের ভিত্তিতে ভিন্ন ভিন্ন এলাকায় কার্যকর হবে ভিন্ন ভিন্ন নীতিমালা।
সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানায়, গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে সিলেট সার্কিট হাউসে অনুষ্ঠিত সভায় সিটি কর্পোরেশনের ভাগ করা এলাকাগুলোর বিষয়ে কয়েকটি নীতিগত সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। এগুলো আজ বুধবার প্রস্তুত করে সিভিল সার্জন অফিসে পাঠানো হবে। সিভিল সার্জন কার্যালয় থেকে সেগুলো অনুমোদিত হয়ে আসলে আগামীকাল বৃহস্পতিবার ভোর ৬টা থেকে সেই সিদ্ধান্তগুলো কার্যকর করা হবে। সিলেট জেলা কোভিড নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি ও সিলেটের জেলা প্রশাসক এম কাজী এমদাদুল ইসলাম, সিলেটের সিভিল সার্জন ডা: প্রেমানন্দ মন্ডল ও পুলিশ সুপার মো: ফরিদ উদ্দিনসহ সংশ্লিষ্টরা সভায় উপস্থিত ছিলেন।
সিদ্ধান্তগুলো হচ্ছে- সিলেট সিটি কর্পোরেশন এলাকার রেড জোনে ওষুধের দোকান ২৪ ঘণ্টা এবং মুদি দোকানগুলো বিকাল ৪টা পর্যন্ত খোলা রাখা যাবে। আর বাকি সকল ধরণের দোকান-পাট বন্ধ থাকবে। রেড জোনে বন্ধ থাকবে সকল ধরণের গণপরিবহন। তবে, জরুরি পরিষেবা চালু থাকবে।
সিলেটের জেলা প্রশাসক এম কাজী এমদাদুল ইসলাম জানান, রেড জোন ঘোষণা নিয়ে তাদের মধ্যে দফায় দফায় বৈঠক হচ্ছে। গতকাল মঙ্গলবার দুপুরের পাশাপাশি রাতেও বৈঠক হয়েছে। সিলেটের সিভিল সার্জন রেড জোন এলাকাসমূহের তালিকা চূড়ান্ত করছেন। আজ বুধবার তালিকা চূড়ান্ত হওয়ার পর এ সংক্রান্ত ঘোষণা দেবেন সিভিল সার্জন। রেড জোন এলাকায় ব্যাংকিং কার্যক্রম চালু থাকা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এ ব্যাপারে বাংলাদেশ ব্যাংকের সিদ্ধান্তই কার্যকর হবে।
বৈঠকে উপস্থিত সিলেট সিটি কর্পোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা: জাহিদুল ইসলাম জানান, নগরীর ১৯টি ওয়ার্ড রেড জোন হিসাবে চিহ্নিত হলেও বৈঠকে নগরীর ২৪টি ওয়ার্ডকে লকডাউন করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। তিনি জানান, নগরীর ২৭ নম্বর ওয়ার্ড রেড জোনের মধ্যে থাকলেও ওই এলাকার আক্রান্তদের বেশিরভাগ আলমপুরের। তাদের বেশিরভাগ বিভাগীয় কমিশনার অফিস, ডিআইজি অফিস ও পাসপোর্ট অফিসে কর্মরত। তাদের অনেকে আবার সিলেট নগরীতে বসবাস করেন। যে কারণে ২৭ নম্বর ওয়ার্ডসহ দক্ষিণ সুরমার ২৫ ও ২৬ নম্বর ওয়ার্ডকে লকডাউনের বাইরে রাখা হয়েছে। তিনি জানান, আজ বুধবার সিটি কর্পোরেশনের পক্ষ থেকে লকডাউনের বিষয়ে মাইকিং করা হবে। আগামীকাল বৃহস্পতিবার সকাল থেকে লকডাউন কার্যকর হবে বলে জানান তিনি।
তিনি জানান, দক্ষিণ সুরমার তিনটি ওয়ার্ড লকডাউনের বাইরে থাকলেও সেখান থেকে দূরপাল্লার যানবাহন চলাচল করবে কিনা সে ব্যাপারে বৈঠকে কোন আলোচনা হয়নি। এ বিষয়ে জেলা প্রশাসন সিদ্ধান্ত নেবে। তবে, জেলা প্রশাসক জানিয়েছেন, সার্বিক বিষয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের প্রজ্ঞাপন অনুসরণ করা হবে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সিলেট বিভাগীয় কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক ডা. আনিসুর রহমান বলেন, চূড়ান্ত সিদ্ধান্তটা এখনও জানতে পারিনি। মৌখিকভাবে জানতে পেরেছি-আগামীকাল বৃহস্পতিবার থেকে সিলেট নগর ও জেলায় নতুন নীতিমালা কার্যকর হবে। এ বিষয়ে লিখিতভাবে আমরা পাবো হয়তো আজ বুধবার। তখন বিস্তারিত বলা যাবে।
সিটি কর্পোরেশনের জরুরি বৈঠক: লকডাউন বাস্তবায়ন নিয়ে সিলেট সিটি কর্পোরেশনের মেয়র, কাউন্সিলর ও কর্পোরেশনের কোভিড-১৯ কমিটির যৌথসভা গতকাল মঙ্গলবার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় কর্পোরেশনের হলে অনুষ্ঠিত হয়। সভায় লকডাউনের সামগ্রিক বিষয়াদি পর্যালোচনা করা হয়। সভায় লকডাউনের কারণে কোন মানুষ যাতে অভূক্ত না থাকে কিংবা কেউ যেন অযথা হয়রানির শিকার না হন-সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সকলকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেয়া হয়।
এদিকে, গত সোমবার বাংলাদেশ ব্যাংকের ডিপার্টমেন্ট অব অফ-সাইট সুপারভিশন থেকে রেড জোন এরাকায় ব্যাংকিং লেনদেন সম্পর্কে নির্দেশনা দিয়ে একটি সার্কুলার জারি করেছে। এতে বলা হয়েছে, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সিটি করপোরেশন জেলা প্রশাসক কর্তৃক ঘোষিত রেড জোন (উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ) এলাকায় অবস্থিত তফসিলী ব্যাংকের শাখা সাধারণভাবে বন্ধ থাকবে । তবে শাখা খোলা রাখা সংক্রান্ত বিষয়ে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের ভিন্নরূপ কোন নির্দেশনা থাকলে সীমিত জনবলের মাধ্যমে সকাল ১০ টা হতে দুপুর সাড়ে ১২টা পর্যন্ত সীমিত লেনদেন করতে পারবে। আর লেনদেন পরবর্তী ব্যাংকের আনুষঙ্গিক কার্যক্রম সম্পাদনের জন্য ব্যাংকের শাখা দেড়টা পর্যন্ত খোলা রাখা যাবে।
তবে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের সহায়তায় এরূপ এলাকায় অবস্থিত ব্যাংকের প্রধান কার্যালয় এবং শাখার কার্যক্রম সকাল ১০ টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত চালু রাখতে হবে, যাতে ব্যাংকের অন্যান্য শাখার কার্যক্রম বিঘিœত না হয়।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, সিটি করপোরেশন, জেলা প্রশাসক কর্তৃক ঘোষিত হলুদ (ইয়েলো) ও সবুজ (গ্রিন) জোনে অবস্থিত তফসিলী ব্যাংকের শাখা সকাল ১০টা হতে দুপুর ২ টা পর্যন্ত সকল প্রকার লেনদেনের জন্য খোলা রাখতে হবে এবং পরবর্তী আনুষঙ্গিক কার্যক্রম সম্পাদনের জন্য বিকাল ৪টা পর্যন্ত শাখা খোলা রাখা যাবে।
এছাড়া, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ গত সোমবার এ সংক্রান্ত ১৮ দফার একটি নির্দেশনা জারি করেছে। এতে বলা হয়েছে, রাত ৮টা থেকে ভোর ৬টা পর্যন্ত খুব জরুরি প্রয়োজন ছাড়া (প্রয়োজনীয় বেচা-কেনা, কর্মস্থলে যাতায়াত, ওষুধ কেনা, চিকিৎসাসেবা, মরদেহ দাফন/সৎকার ইত্যাদি) কোনোভাবেই বাড়ির বাইরে আসা যাবে না। তবে সর্বাবস্থায় বাইরে চলাচলের সময় মাস্ক পরিধানসহ অন্যান্য স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে। অন্যথায় নির্দেশ অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
নির্দেশনায় আরো বলা হয়, কৃষিপণ্য সার, বীজ, কীটনাশক, খাদ্য, শিল্প পণ্য, রাষ্ট্রীয় প্রকল্পের মালামাল, কাঁচাবাজার, খাবার, ঔষধের দোকান, হাসপাতাল ও জরুরি সেবা এবং এসবের সাথে সংশ্লিষ্ট কর্মীদের ক্ষেত্রে এ নিষেধাজ্ঞা প্রযোজ্য হবে না। চিকিৎসাসেবায় নিয়োজিত চিকিৎসক, নার্স ও কর্মী এবং ঔষধসহ চিকিৎসা সরঞ্জামাদি বহনকারী যানবাহন ও কর্মী, গণমাধ্যম(ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়া) এবং ক্যাবল টিভি নেটওয়ার্কে নিয়োজিত কর্মীগণ এ নিষেধাজ্ঞার বাইরে থাকবেন।

উল্লেখ্য,গতকাল মঙ্গলবার রাতে সিলেট সিটি কর্পোরেশনে এক বৈঠকে অনুষ্টিত হয়। বৈঠকে বেশ কয়েকজন কাউন্সিলর প্রস্তাব করেন, বৃহস্পতিবারের বদলে শনিবার থেকে নগরীতে লকডাউন শুরু করার। 

সিলেট সিটি কর্পোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. জাহিদুল ইসলাম গণমাধ্যমকে বলেন, এক দিনের মধ্যে লকডাউন না দেয়ার পক্ষে কাউন্সিলররা মতামত দিয়েছেন। কারণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন, এবারের লক ডাউন খুবই শক্ত হবে। মানুষকে ২ দিন দিন সময় দিলে সহজে প্রয়োজনীয় বাজার করতে পারবে। হঠাৎ সবকিছু বন্ধ হলে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী জিনিসপত্রের দাম বাড়াতে পারে। এছাড়া তিনি বলেন, দুই দিন সময় দেয়া হলে সিটি কর্পোরেশন থেকে মাইকিং করে মানুষকে লকডাউন সম্পর্কে জানিয়ে দেয়া যাবে। শুক্রবার মসজিদের ইমামরাও লকডাউনের বিষয়ে মানুষকে সহজে জানাতে পারবেন।

আপনার মন্তব্য