আজ সোমবার, ৩০ মার্চ, ২০২০

সিলেট বিভাগের চার জেলায় ৬৩৬ জনকে হোম কোয়ারেন্টাইনে

গোয়াইনঘাটের কিশোরসহ শামসুদ্দিন হাসপাতালের আইসোলেশনে দু’জন

 প্রকাশিত: ২০২০-০৩-১৯ ১২:০৮:৪৪

করোনাভাইরাসের সংক্রমণ এড়াতে সিলেট বিভাগের চার জেলায় ৬৩৬ জনকে হোম কোয়ারেন্টাইনে পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। তাদের বেশিরভাগই সম্প্রতি প্রবাস ফেরত এবং তাদের স্বজন। গতকাল বুধবার বিকেলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সিলেটের বিভাগীয় কার্যালয় সূত্রে এ তথ্য জানা যায়। এদের মধ্যে সিলেট জেলায় সর্বাধিক ৪২২ জন রয়েছেন। এছাড়া সুনামগঞ্জে ৪০জন, মৌলভীবাজারে ১৫১ জন এবং হবিগঞ্জে ২৩ জন হোম কোয়ারেন্টাইনে রয়েছেন।
সিলেট ঃ সিলেটের সিভিল সার্জন ডা. প্রেমানন্দ মন্ডল জানান, ‘বিদেশ ফেরত ব্যক্তি ও তাদের পরিবারের ৪১০ সদস্য হোম কোয়ারেন্টাইনে আছেন। এছাড়া, সিলেটের শহীদ শামসুদ্দিন সদর হাসপাতালের আইসোলেশন ওয়ার্ডে দু’জনকে রাখা হয়েছে।’ আর ১০জনকে সদর হাসপাতাল থেকে ছেড়ে দেয়া হয়েছে। তিনি জানান, গতকাল বুধবার সিলেট জেলায় ১২১ জনকে হোম কোয়ারেন্টাইনে পাঠানো হয়। এর আগের দিন মঙ্গলবার পর্যন্ত কোয়ারেন্টাইনে ছিলেন-২৮৯ জন।


তিনি জানান, ‘কোয়ারেন্টাইনে থাকা লোকজন নিয়ম মানছেন কি না, সে বিষয়ে খোঁজ নিতে স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারী ছাড়াও স্থানীয় প্রশাসনের লোকজন ও জনপ্রতিনিধিদের বলা হয়েছে। স্বাস্থ্য বিভাগের বিদ্যমান জনবল দিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা হচ্ছে।’
গোয়াইনঘাট ঃ গোয়াইনঘাট থেকে নিজস্ব সংবাদদাতা জানান, গোয়াইনঘাটে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত সন্দেহে এক কিশোরকে সিলেট শহীদ শামসুদ্দিন হাসপাতালে প্রেরণ করা হয়েছে। রাত ১১টায় তাকে হাসপাতালের আইসোলেশন ইউনিটে ভর্তি করা হয় বলে জানান ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের উপ-পরিচালক ডা: হিমাংশু লাল রায়। তিনি জানান, হাসপাতালে ওই কিশোরের অবস্থা স্থিতিশীল রয়েছে।
পারিবারিক সূত্র জানিয়েছে, কিছুদিন আগে কিশোরের চাচাত ভাই সিঙ্গাপুর থেকে দেশে আসেন এবং কিশোর তার সাথে চলাফেরা করে। এরই প্রেক্ষিতে গতকাল বুধবার কিশোরের জ্বর, সর্দি ও কাশি দেখা দিলে স্বজনরা দ্রুত গোয়াইনঘাট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। এসময় কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে দ্রুত সিলেট নগরীর শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালে প্রেরণ করেন।
জানতে চাইলে উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডাঃ রেহান উদ্দিন জানান, উপজেলা সদরের বীর মুক্তিযোদ্ধার সন্তানকে হাসপাতালে নিয়ে আসলে আমরা তাকে দ্রুত শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালে প্রেরণ করি। তিনি আরও জানান কিশোরের জ্বর, কাশি ও সর্দি দেখা দেয়ায় প্রতিবেশীরা আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। তাই তাকে দ্রুত উপজেলা থেকে সিলেটে হস্তান্তর করি।
জকিগঞ্জ ঃ জকিগঞ্জ থেকে নিজস্ব সংবাদদাতা জানান, বিশ্বে ছড়িয়ে পড়া প্রাণঘাতী করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে জকিগঞ্জে মহিলাসহ ৩ প্রবাসীকে হোম কোয়ারেন্টাইনে (নিজ বাড়িতে পর্যবেক্ষণে) রাখা হয়েছে। গতকাল বুধবার সন্ধ্যার দিকে তারা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পৌঁছলে কর্মরত চিকিৎসক তাদেরকে নিজ বাড়িতে পর্যবেক্ষণে রাখেন।
জকিগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের প্রশাসক ডা. আব্দুল্লাহ আল মেহেদী এ তথ্য নিশ্চিত করে জানান, হোম কোয়ারেন্টাইনে একজন মহিলাসহ দুজন পুরুষ রয়েছেন। তারা প্রবাস ফেরত। চিকিৎসক দিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে। এখনও কারও শরীরে করোনার অস্তিত্ব মেলেনি। তারপরও অন্তত ১৪ দিন তারা বাড়ির বাইরে না যাওয়ার জন্য নিষেধ করা হয়েছে। তবে গোপনীয়তার স্বার্থে হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকাদের নাম প্রকাশ করেননি তিনি। তিনি আরও জানান, হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকলেই আতঙ্কিত হওয়া ঠিক নয়। সচেতনতা বৃদ্ধি করলেই ভাইরাস থেকে বাঁচা সম্ভব হবে।
হবিগঞ্জ ঃ হবিগঞ্জ থেকে প্রতিনিধি জানান, হবিগঞ্জে গতকাল বুধবার পর্যন্ত ২৩জনকে হোম কোয়ারেন্টাইনে রাখা হয়েছে। গত মঙ্গলবার এ সংখ্যা ছিল ৯ জন। তাদের অধিকাংশই বিদেশ ফেরত। এ অবস্থায় জেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন, স্বাস্থ্য বিভাগ ব্যাপক জনসচেতনতামূলক প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছে। কাউকে আতঙ্কিত না হয়ে সচেতন থাকার পরামর্শ দেয়া হচ্ছে।
এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ কামরুল হাসান বলেন, হোম কোয়ারেন্টাইন মানে আক্রান্ত নন। অধিক সতর্কতা হিসেবে তাদের ঘরে থাকার পরামর্শ দেয়া হচ্ছে। যদি কেউ সরকারের নির্দেশনা না মানেন-তবে তাদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হবে। সকলকে সতর্ক থাকলে করোনা মোকাবেলা করা কঠিন বিষয় নয়।
মৌলভীবাজার ঃ মৌলভীবাজার থেকে নিজস্ব সংবাদদাতা জানান, করোনাভাইরাস প্রতিরোধে মৌলভীবাজারে ১৫১ জনকে হোম কোয়ারেন্টাইনে রাখা হয়েছে। তাদের বেশির ভাগই বিদেশ ফেরত, কয়েকজন তাদের নিকট আত্মীয়ও রয়েছেন। যারা প্রবাসীদের সংস্পর্শে ছিলেন।
সিভিল সার্জনের কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, মৌলভীবাজার সদর উপজেলায় ১০জন, কুলাউড়ায় ২৪জন, জুড়িতে ১৩জন, বড়লেখায় ১৭জন, শ্রীমঙ্গলে ৪১জন, কমলগঞ্জ ৩৭জন এবং রাজনগর ৯জনসহ সর্বমোট ১৫১জনকে হোম কোয়ারেন্টাইনে রাখা হয়েছে। যাদের রাখা হয়েছে তারা ইতালি, আমেরিকা এবং মধ্যপ্রাচ্য ফেরত এবং তাদের নিকট আত্মীয়।
তাদের শরীরে করোনা ভাইরাসজনিত কোনো সমস্যা আছে কিনা তা দেখার জন্য হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকতে বলা হয়েছে। সমস্যা দেখা দিলে পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য ঢাকা থেকে বিশেষজ্ঞ দল তাদের নমুনা সংগ্রহ করে নিয়ে যাবেন।
মৌলভীবাজারের সিভিল সার্জন ডা. তৌহীদ আহমদ জানান, আমরা মানুষকে সচেতন করতে কাজ করছি। আমরা সংবাদের মাধ্যম সাধারণ মানুষকে জানাতে চাই, কাজ ছাড়া বাইরে বের হবেন না, ভিড় এড়িয়ে চলুন। তিনি আরো বলেন, করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসার পূর্ব প্রস্তুতি হিসেবে মৌলভীবাজার জেলায় ১১৬টি বেড প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
কুলাউড়া ঃ কুলাউড়া অফিস জানায়, কুলাউড়া উপজেলায় গতকাল বুধরার পর্যন্ত আরো ২২জকে হোম কোয়ারেন্টাইনে রাখা হয়েছে। এই নিয়ে হোম কোয়ারেন্টাইনে রাখা প্রবাসীর সংখ্যা মোট ২৪জন।
উপজেলা স্বাস্থ্য প্রশাসক ডাঃ নূরুল হক জানান, এই সকল প্রবাসীরা দুবাই, মালয়েশিয়া, কাতার, থাইল্যান্ড, ফ্রান্স, ইতালি, আমেরিকা, বাহারাইন, সৌদি ও ওমান সহ বিভিন্ন দেশ থেকে প্রবাসীরা গত ৩ থেকে ১৬ মার্চ পর্যন্ত করোনার ভয়ে গ্রামের বাড়িতে আসেন। এই সংখ্যা আরো বৃদ্ধি পেতে পারে। এই সকল দেশের প্রবাসীরা মোবাইল ফোনের মাধ্যমে আত্মীয়স্বজনকে বিভ্রান্তিকর তথ্য পাঠিয়ে আতঙ্কগ্রস্ত করে তুলেছে। উপজেলার বিভিন্ন হাটে বাজারে জন সমাগম মারাত্মকভাবে হ্রাস পেয়েছে। জন সমাগম এড়ানোর জন্য ধর্মীয় অনুষ্ঠান বাতিল করা হয়েছে। বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকলেও শিক্ষকদের বাসায় গ্রুপে প্রাইভেট পড়ানো অব্যাহত রয়েছে।
সুনামগঞ্জ ঃ সুনামগঞ্জ থেকে প্রতিনিধি জানান, সুনামগঞ্জে ৪০জনকে হোম কোয়ারেন্টাইনে রাখা হয়েছে। এর মধ্যে সদর উপজেলায় ৯জন, দোয়ারাবাজারে ৩জন, বিশ^ম্ভরপুরে ৬জন, জামালগঞ্জে ১জন, দিরাইয়ে ২জন, দক্ষিণ সুনামগঞ্জে ১জন ও জগন্নাথপুরে ১৮জন। সুনামগঞ্জের সিভিল সার্জন ডা. মো. শামস উদ্দিন জানান, গতকাল বুধবার সকাল ৮টা পর্যন্ত গত ২৪ ঘণ্টায় হোম কোয়ারেন্টাইনে রাখা হয়েছে।

আপনার মন্তব্য