আজ রবিবার, ০৮ ডিসেম্বর, ২০১৯

গ্যাসের দামবৃদ্ধি,ডেঙ্গুর আতঙ্কের মধ্যেই আবার বন্যার আশঙ্কা

 প্রকাশিত: ২০১৯-০৭-১৫ ১৯:০৭:৪৬

সম্প্রতি গ্যাসের দাম বাড়িয়ে সরকার সমালোচনার মুখে আছে। গ্যাসের দাম বাড়ানোর ফলে সাধারণ মানুষের ওপর চাপ বাড়বে বলে মনে করা হচ্ছে। অবশ্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশনের সমাপনী ভাষণে বলেছেন, যারা গ্যাসের দাম নিয়ে আন্দোলন করছেন, তারা প্রকৃত অবস্থা চিন্তা করছেন না। গ্যাসের দাম ৭৫ শতাংশ বাড়ানোর প্রয়োজন ছিল। কিন্তু জনগণের কথা চিন্তা করে তা করা হয়নি। ৩২ দশমিক ৮ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী আরো বলেছেন, দেশের প্রাকৃতিক গ্যাস চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল। চাহিদা ছিল ৩ হাজার ৭০০ এমএমসিএফটি, কিন্তু সরবরাহ করা যাচ্ছিল মাত্র ২ হাজার ৬০০ এমএমসিএফটি। এই চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে ১ হাজার এমএমসিএফটি এলএনজি আমদানি শুরু হয়েছে। প্রতি ঘনমিটার এলএনজি আমদানির মূল্য পড়ছে ৬১ দশমিক ১২ টাকা। কিন্তু সেখানে আমরা নিচ্ছি ৯ দশমিক ৮০ টাকা। অর্থাৎ ৫১ দশমিক ৩২ টাকা ভর্তুকি দিতে হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী তার সরকারের গৃহীত সিদ্ধান্তের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরবেন, সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু যারা সরকারের বাইরে আছেন, তারা ভিন্ন যুক্তি দিচ্ছেন।

 গ্যাস খাতে দুর্নীতি এবং অনিয়ম নিয়ে অনেক কথা আছে। অনেকেই বলে থাকেন—দুর্নীতি ও অনিয়ম বন্ধ করতে পারলে গ্যাসে সরকারকে ভর্তুকি দিতে হতো না। দুর্নীতি বন্ধে কঠোর পদক্ষেপ না নিয়ে সরকার দাম বাড়িয়ে ঘাটতি মেটানোর সহজ পথ নিয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটি মনে করে, দেশের প্রাকৃতিক গ্যাস উত্তোলন করলে বর্তমানের চেয়ে খরচ কমার কথা। 

গ্যাসের দাম নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া তথ্যের সঙ্গেও তারা একমত নয়। সরকার বেশি দামে গ্যাস কিনছে বলেও অভিযোগ আছে। বিশ্ববাজারে গ্যাসের দাম যখন ৫০ শতাংশ কমেছে, তখন বাংলাদেশে ৩৩ শতাংশ বাড়ানো হলো। গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির ফলে শুধু গ্যাস ব্যবহারকারীদের ওপর চাপ পড়ে তাই নয়, পরিবহন, শিল্পপণ্য, বিদ্যুৎ, বাসাভাড়া বৃদ্ধির মাধ্যমে সব পর্যায়ের মানুষের ওপরই চাপ পড়ে। এতে উৎপাদনশীল খাত ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তার প্রতিযোগিতা, সক্ষমতা কমে।

গ্যাসের দাম বাড়ানোর প্রতিবাদে বাম দলগুলো একদিন আধাবেলা হরতাল ডেকেছিল। বাম দলের হরতালে বিএনপিও নৈতিক সমর্থন জানিয়েছিল। তবে হরতালে তেমন সাড়া পাওয়া যায়নি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যারা গ্যাসের দাম বাড়ানোর প্রতিবাদ করেছেন, তারাও রাস্তায় বের হওয়ার গরজ বোধ করেননি। জোরালো প্রতিবাদ হলেই সরকার তার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করবে, এটা কেউই আশা করেন না। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চীন সফর শেষে দেশে ফিরে সংবাদ সম্মেলনে স্পষ্ট করেই বলেছেন, উন্নয়ন চাইলে গ্যাসের দামবৃদ্ধি সহ্য করতে হবে। দেশের কোনও মানুষই নিশ্চয়ই উন্নয়নবিরোধী নয়। সবাই উন্নয়ন চায়। আবার জীবন-জীবিকার ওপর বাড়তি চাপ আসুক, সেটাও মানুষ চায় না।


 সরকারকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে কার করে নিম্নবিত্ত, মধ্যবিত্ত এবং নির্ধারিত আয়ের মানুষের ওপর চাপ সৃষ্টি করার পথে অগ্রসর হলে এক সময়ে এটা গণঅসন্তোষ ওপর চাপ সৃষ্টি করা হবে? যারা নানা উপায়ে সম্পদের মালিক হচ্ছে, ব্যাংকের টাকা লোটপাট করছে, তাদের কাছ থেকে টাকা আকরতে পারে। সরকারবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর স্থবিরতা বা নিষ্ক্রিয়তার সুবিধা এখন সরকার পাচ্ছে, কিন্তু একসময়দায় না তৈরি 

গ্যাস নিয়ে মানুষের মনোকষ্ট দূর হওয়ার আগেই রা পরিস্থিতি বদলাতেও পারে। কখন, কোন ইস্যুতে মানুষ প্রবল প্রতিবাদী হয়ে উঠবে, তা আগে থেকে বলা যায় না। ছোট ছোট অনেক ঘটনার সম্মিলনে একসময় বড় বিস্ফোরণ হওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।জধানীতে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ছে ডেঙ্গু। ডেঙ্গুতে ঢাকায় ১২ জুলাই পর্যন্ত ১১ জনের মৃত্যু হয়েছে। আক্রান্ত হয়েছেন প্রায় চার হাজার। আক্রান্তের সংখ্যা প্রতিদিনই বাড়ছে। মানুষের মধ্যে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ছে। মশা থেকে ডেঙ্গু ছড়ায়। অথচ মশা মারার কোনও কার্যকর ব্যবস্থা নেই। মশা নিধনের কার্যকর ওষুধ নেই বলে ঢাকা দক্ষিণ সিটির মেয়র সাঈদ খোকন জানিয়েছেন। বর্ষা মৌসুমে মশার উপদ্রব বাড়ে ‘এটা কি সিটি মেয়রদের জানা ছিল না? মশা নিধনের জন্য আগেভাগে কেন প্রস্তুতি নেওয়া হয়নি?’ মশার উপদ্রব ও ডেঙ্গুর প্রকোপ বেড়ে যাওয়ায় নগরবাসী দায়ী করছেন দুই সিটি মেয়রের গাফিলতি বা উদাসীনতাকে। এখানেও অনিয়ম এবং দুর্নীতির অভিযোগ আছে।

গত বছরের তুলনায় এবার ডেঙ্গুর প্রকোপ কয়েকগুণ বেশি। সিটি করপোরেশন মশা মারতে যে ওষুধ ব্যবহার করছে, সেগুলো অকার্যকর হয়ে পড়েছে। নতুন কার্যকর ওষুধ আনার উদ্যোগ নেওয়ার কোনও খবর নেই।

ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে দ্রুত ব্যবস্থা না নিতে পারলে মানুষের ক্ষোভ গিয়ে পড়বে সরকারের বিরুদ্ধে। প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা গত ১২ জুলাই বলেছেন, ‘আওয়ামী লীগ দেশের জনগণকে অবহেলা করে দেশ পরিচালনা করে না বরং মানুষের কল্যাণে কাজ করে গেছে। সুখ-দুঃখে সবসময় জনগণের পাশে থেকেছে।’ কিছু কিছু ঘটনায় এখন মানুষের মনে আওয়ামী লীগ সম্পর্কে বিভ্রান্তি তৈরি হচ্ছে বলে অনেকে মনে করছেন। আওয়ামী লীগের কিছু নেতাকর্মী জনগণকে অবহেলা করতে শুরু করছে। যারা যেখানে যে দায়িত্ব পাচ্ছেন, সে দায়িত্ব পালনেও অবহেলা দেখা যাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী যেখানে নজর দিতে পারেন না বা নির্দেশনা দেন না, সেখানেই দেখা দেয় সঙ্কট বা অচলাবস্থা। প্রধানমন্ত্রী যে স্বপ্ন ও লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছেন, তার সহযোগী-সহযাত্রীরা যদি তাকে তথাযথভাবে অনুসরণ করতে না পারেন, তাহলে কীভাবে চলবে?

ডেঙ্গুর আতঙ্কের মধ্যেই আবার বন্যার আশঙ্কা দেখা যাচ্ছে। বন্যা পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। বন্যায় মানুষের জীবন ও সম্পদের যাতে ক্ষতি না হয়, তার জন্য সব ধরনের পূর্ব প্রস্তুতি থাকতে হবে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ আমাদের জন্য কোনো নতুন ব্যাপার নয়। দুর্যোগ মোকাবিলায় আমাদের দক্ষতা ও পারদর্শিতাও আছে।

দুর্যোগ-দুর্বিপাকে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতি আমাদের দেশে ছিল। কিন্তু দোষারোপের রাজনীতিতে অভ্যস্ত হয়ে আমরা এখন আমাদের ভালো ঐতিহ্যগুলো হারাতে বসেছি। সবকিছুর দায় সরকারের ওপর চাপিয়ে নিজেরা নির্বিকার থাকার নষ্ট রাজনীতি আমাদের গ্রাস করতে বসেছে। মানুষের জন্য এবং মানুষের কল্যাণে যে রাজনীতি, সেই রাজনীতির ধারা আবার আমাদের দেশে শক্তি সঞ্চয় করতে পারলেই সবার জন্য ভালো হবে।

লেখক: কলামিস্ট

আপনার মন্তব্য