আজ রবিবার, ০৮ ডিসেম্বর, ২০১৯

ডাক্তাররাই সত্যিকারের সুপার হিরো

 প্রকাশিত: ২০১৯-০৮-১১ ১৭:০৬:২০

আপনারা সবাই নিশ্চয়ই এখন ঈদের প্রস্তুতি নিয়ে ব্যস্ত। ঈদুল আজহার প্রস্তুতির ধরনটা একটু ভিন্ন। অনেকেই হয়তো এখন গরুর হাটে ব্যস্ত, শেষ মুহূর্তে ভালো দামে একটা গরু কিনতে পারাও অনেক আনন্দের।

 যারা একটু দাম দিয়ে আগেই গরু কিনে ফেলেছেন, তারা নিশ্চয়ই এখন গরুর পরিচর্যা, লালন-পালনে ব্যস্ত। অনেকেই চাটাই, কাঠের টুকরো, ছুরি-কাচি কেনা নিয়ে ব্যস্ত হয়তো। বা কোরবানির জন্য প্রয়োজনীয় মসলার মার্কেটেও ব্যস্ততা বেড়েছে। ঈদুল আজহায় ঈদুল ফিতরের মতো সুপার মার্কেটে ভিড় কম।

 তবুও নারীদের মধ্যে যারা অন্য ঝামেলা গুছিয়ে ফেলেছেন, তারা হয়তো চট করে একবার মার্কেটে ঢুঁ মেরে আসতে চাইবেন। শেষ বেলায় একবার পার্লারে যাওয়াটাও কম জরুরি নয়। আচ্ছা, আপনারা কি একবার খোঁজ নিয়েছেন, যাদের আপনারা কথায় কথায় ‘কসাই’ বলে গালি দেন, সেই ডাক্তাররা এখন কী করছেন? প্লিজ একটু খোঁজ নিন।

আমি একটু সহযোগিতা করতে পারি। তাদের বাসায় পাবেন না। গ্রামের বাড়িতেও পাবেন না। গরুর হাট, মসলার বাজার, ছুরি-কাচির দোকান, শপিংমল, পার্লার- কোথাও খুঁজে পাবেন না। তাদের পাবেন আপনি হাসপাতালে। সরকার ডেঙ্গু পরিস্থিতির কারণে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সবার ছুটি বাতিল করেছে। এটি একটি আনুষ্ঠানিকতা মাত্র।

 সরকার ছুটি বাতিল না করলেও এবারের ঈদে ডাক্তাররা কেউ হাসপাতাল ছেড়ে ঈদ আনন্দে শামিল হতন না। ডাক্তাররা এমনই।

অথচ এই ডাক্তারদের নিয়ে আমাদের ক্ষোভের অন্ত নেই। যত অসুখ নিয়েই ডাক্তারের কাছে যাই, বেরুনোর সময় মনে মনে কসাই বলে গালি দিই। এতক্ষণ বসিয়ে রাখলো কেন, এত কম সময় দিলো কেন, এত টাকা ভিজিট নিলো কেন, এতগুলো টেস্ট করতে দিলো কেন; অনেক অভিযোগ। 

অভিযোগগুলোর সবক’টিই সত্য। কেন সত্য? এতক্ষণ বসিয়ে রেখেছে, কারণ আপনারা অনেক বেশি লোক গেছেন ডাক্তারের চেম্বারে। ডাক্তার তো আর সবাইকে আগে বা একসঙ্গে দেখতে পারবেন না। আর এমনও নয়, ডাক্তার আপনাকে বাইরে বসিয়ে রেখে ভেতরে খোশগল্প করছেন। 

এত কম সময় দিলো কেন জানেন? কারণ, আপনাকে বেশি সময় ধরে দেখলে পরের রোগীদের আরও বেশি দেরি হবে। ডাক্তাররাও মানুষ, তারা তো আর রাতভর রোগী দেখবেন না। আপনি যদি আশা করেন আগের রোগীকে কম সময় দেবেন, আর আপনাকে অনেকক্ষণ ধরে দেখবেন; তাহলে কি সেটা ঠিক হবে? এত টাকা ভিজিট নিলো কেন? কত টাকা?

 বড় জোর এক হাজার টাকা তো। ডাক্তারের চেম্বার থেকে বেরিয়ে ফাস্টফুডের দোকানে গিয়ে কিন্তু দুই হাজার টাকা বিল দিয়ে দেবেন মনের আনন্দে। আপনার কাছ থেকে এক হাজার টাকা বিল নেওয়ার যোগ্য হতে কিন্তু সেই ডাক্তারকে ৪০ বছরের অভিজ্ঞতা অর্জন করতে হয়েছে।  

যে সমস্যা নিয়ে আপনি একশ টাকায় পাড়ার দোকানে এমবিবিএস ডাক্তারকে দেখিয়ে সমাধান পেতে পারতেন, সেই সমস্যা নিয়ে আপনি কোনও ব্যস্ত প্রফেসরের চেম্বারে ভিড় বাড়াচ্ছেন। সমস্যাটা কার, আপনার না সেই প্রফেসরের? আপনি যদি হিসাব কষেন, রোগীপ্রতি এক হাজার ভিজিট, দিনে যদি ৫০ জন রোগী দেখেন; প্রতিদিন ৫০ হাজার টাকা আয়।

 বিষয়টা কিন্তু অত সরল নয়। তিনি যেখানে বসেন, সেই হাসপাতাল কর্তৃপক্ষও কিন্তু ভাগ পায়। এত টেস্ট দেয় কেন জানেন? কিছু টেস্ট তো দিতেই হবে। না হলে তিনি রোগ ধরবেন কীভাবে। 

কিন্তু অপ্রয়োজনীয় কিছু টেস্টও তাকে দিতে হয়। কারণ, সেই টেস্ট না দিলে তার নিরাপদ চেম্বারটি নাও থাকতে পারে। একটা নির্ধারিত মাত্রার চেয়ে কম টেস্ট দিলে, বড় জোর তিন মাস অপেক্ষা করবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।

আপনি নিশ্চয়ই বলবেন, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বাদ দেবেন কেন, সৎ হলে তো সেই ডাক্তার নিজেই ‘লাত্থি’ মেরে চলে যাবে, নিজের মতো চেম্বার দেবে। খুব ভালো পরামর্শ। কিন্তু নিজের চেম্বার করতে তাকে বাড়ি ভাড়া করতে হবে। সেই বাড়ির ভাড়া, পানি-গ্যাস-বিদ্যুৎ বিল, নিরাপত্তা সব মিলিয়ে এক হাজার টাকা ভিজিটেও পোষাবে না। আরেকটা খবর তো আপনারা জানেনই না।


 আলাদা চেম্বার দিলে, রোগীদের সঙ্গে কিছু উটকো মাস্তানও জুটে যায়। সব শেষে চেম্বারে ঢুকে তারা বলেন, ডাক্তার সাহেব কত কামাইলেন? কমিশনটা দিয়ে যান। এরপর আর কারও ব্যক্তিগত চেম্বার করার সাহস থাকে না। মাস্তানের উৎপাত থেকে বাঁচতে তারা হাসপাতাল মালিকের অন্যায় আবদারের কাছে নতিস্বীকার করতে বাধ্য হন।

ডাক্তারদের বিরুদ্ধে এমন হাজারটা অভিযোগ আমি জানি। ঢাকার বাইরে পোস্টিং হলে কেউ যেতে চান না। গেলেও ঠিকমতো অফিস করেন না।

 এ অভিযোগও মিথ্যা নয়। তবুও ডাক্তারদেরই আমি সুপার হিরো মনে করি। গত নভেম্বরে মাশরাফির সঙ্গে ডাক্তারদের লেগেছিল। তখন আমি বাংলা ট্রিবিউনে লিখেছিলাম ‘মাশরাফিরা হিরো, ডাক্তাররা সুপার হিরো’।

 এই ‘সুপার হিরোগিরিটা’ তারা প্রতিদিনই করেন, মানে প্রতিদিনই কারও না কারও জীবন বাঁচান। সুপার হিরো ছাড়া আর কে পারে এভাবে মানুষের জীবন বাঁচাতে। তবে তাদের প্রতিদিনের ‘সুপার হিরোগিরিটা’ সেভাবে চোখে পড়ে না। তবে এবার ডাক্তার ভাইয়েরা গোটা জাতির চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিলেন, তারাই সত্যিকারের সুপার হিরো।

গত জুন মাসের শেষ দিকে আমি সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের সহকারী পরিচালক ডা. মামুন মোর্শেদের রুমে বসেছিলাম। এমন সময় মেডিসিন বিভাগের ডা. নাজমুল এসে জানালেন, তাদের হাসপাতালে মোট ৪০ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি আছেন।

 তারা সবাই বিভিন্ন ওয়ার্ডে ছড়িয়ে আছেন। তাই চিকিৎসা দিতে অসুবিধা হচ্ছে। ডা. নাজমুল প্রস্তাব করেন একটা ডেঙ্গু কর্নার করার, যাতে সব রোগীকে একসঙ্গে চিকিৎসা দেওয়া যায়। তিনি বললেন, প্রয়োজনে ডেঙ্গু ওয়ার্ডের দেখভালের কাজটি করতে রাজি আছেন তিনি। 

তখনও ডেঙ্গু নিয়ে মিডিয়ায় হইচই শুরু হয়নি। আমি একটু অবাকই হলাম, একজন ডাক্তার নিজ থেকে এসে দায়িত্ব নিয়ে ডেঙ্গু কর্নার করতে চাইছেন! সেদিনই পরিচালক উত্তম বড়ুয়ার সঙ্গে আলোচনার পর সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে ডেঙ্গু কর্নার চালু হয়েছিল।

 তারপর গত দেড় মাসে দ্রুতই পাল্টেছে পরিস্থিতি। সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা ৪০০ ছাড়িয়েছে। ডেঙ্গু কর্নার নয়, পুরো হাসপাতালটাই ডেঙ্গু হাসপাতালে পরিণত হয়েছে। হাসপাতালের বারান্দা, করিডোর, মেঝে কোথাও পা ফেলার জায়গা নেই, গিজগিজে ভিড়। ভর্তি হওয়ার মতো একজন রোগীকেও ফিরিয়ে দেওয়া হয়নি। তবে অনেককেই যথাযথ পরামর্শ দিয়ে বাসায় পাঠানো হয়েছে।

 আরও অনেক রোগীকে ফিরিয়ে দিতে পারলে হাসপাতালের পরিবেশ আরও ভালো হতো। হাঁটার সময় রোগীর সঙ্গে আপনার ধাক্কা লাগতো না, আপনাকে নাক সিটকাতে হতো না। সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে বিনামূল্যে ডেঙ্গুর টেস্ট করা হয়। 

প্রতিদিন হাজারের বেশি মানুষ সেখানে টেস্ট করাতে গেছে। তবে এ চিত্র শুধু সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের নয়; ঢাকা মেডিক্যাল, মিডফোর্ড, মুগদা, কুর্মিটোলা- ঢাকার সব সরকারি হাসপাতালেই একই চিত্র। 

পাশাপাশি বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে যান, ভিড় আছে, কিন্তু বাড়তি রোগী ভর্তি নেই। ছিমছাম পরিবেশ। ঢাকার কয়েকটি হাসপাতাল আছে, যেগুলোর বারান্দায় হাঁটলে মনে হবে হোটেল সোনারগাঁওয়ের বারান্দায় হাঁটছি। সুনসান। কোনও উত্তেজনা নেই। সব যেন রোবোটিক।

স্কয়ার হাসপাতাল ২২ ঘণ্টায় এক রোগীর বিল করেছে ১ লাখ ৮৭ হাজার টাকা। ইউনাইটেড হাসপাতাল ৫ দিনে এক ডেঙ্গু রোগীর বিল করেছে ৫ লাখ ৮২ হাজার টাকা। এসব হাসপাতালে আরাম বেশি, বিল বেশি, মৃত্যুহারও বেশি। 

বরং যে হাসপাতালগুলোর বারান্দা কাওরান বাজারের মাছ বাজারের মতো, সেখানে মৃত্যুহার কম। এটা কীভাবে সম্ভব? সম্ভব, কারণ এসব হাসপাতালের ডাক্তাররা, যাদের আমরা সারাক্ষণ গালি দেই, সেসব ডাক্তার, নার্স আর স্বাস্থ্যকর্মীরা জীবন বাজি রেখে ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে লড়াই করছেন। 

সরকারি ঘোষণার অনেক আগে থেকেই তারা ছুটির কথা ভুলে গেছেন। ক্লান্ত হলেই কেবল বিশ্রামের জন্য শিফট চেঞ্জ, কেউ ঘড়ির দিকে তাকান না। সারাক্ষণ ডেঙ্গু রোগীর মাঝে থাকেন বলে ডাক্তার ও স্বাস্থ্যকর্মীরাই ছিলেন সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে।

 আর সেই ঝুঁকির মূল্য তাদের দিতে হয়েছে জীবন দিয়ে। এ মৌসুমেই ৯ জন ডাক্তার ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন। আক্রান্ত হয়েছেন অনেকে। ডেঙ্গু আক্রান্ত হওয়ার পরই কেবল বাধ্যতামূলক ছুটিতে যেতে হয়েছে। অনেক ডাক্তারকে জানি, যারা এই লড়াইয়ের ময়দান ছেড়ে যাওয়ার ভয়ে নিজের ডেঙ্গু গোপনে চিকিৎসা করেছেন।

 দুই মেয়র যখন কথা বলে লোক হাসাচ্ছেন, হাইকোর্টের নির্দেশের পরও যখন কার্যকর মশার ওষু্ধ আসে না, স্বাস্থ্যমন্ত্রী যখন সপরিবারে মালয়েশিয়া ভ্রমণে যান; তখন ডাক্তার ও স্বাস্থ্যকর্মীরা নীরবে, কোনও ক্রেডিট দাবি না করে কাজ করে গেছেন এবং যাচ্ছেন।

আবারও প্রশ্ন করি, এটা কীভাবে সম্ভব? উত্তর আমি জানি। আমাদের এটিএন নিউজের টিমে অনেক ‘ফাঁকিবাজ’ রিপোর্টার আছে। দেরি করে অফিসে আসে, আগেভাগে চলে যায়, নির্ধারিত সময়ের আগেই স্পট থেকে রিপ্লেস চায়। 

কিন্তু কোনও একটা সত্যিকারের ক্রাইসিসে ফেলে দেন, দেখবেন তাকে আর নড়ানো যাবে না। সবচেয়ে ফাঁকিবাজ রিপোর্টারকেও ২৪ ঘণ্টার আগে সরাতে পারবেন না। আসলে সত্যিকারের ক্রাইসিস আমাদের ভেতরের মানুষটাকে বের করে আনে।

 সরকার যতই বলুক ডেঙ্গু গুজব, মিডিয়ার তৈরি; বাস্তবতা হলো, এবার ডেঙ্গু সবচেয়ে ভয়ঙ্কর পরিস্থিতি তৈরি করেছে, এবার মৃত্যুঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। আর কেউ না বুঝলেও ডাক্তাররা পরিস্থিতি বুঝেছেন এবং গেরিলা কায়দায় লড়াই করেছেন। আমার কথা যদি আপনাদের বিশ্বাস না হয়, আপনার বাসার কাছাকাছি যে কোনও হাসপাতালে গিয়ে দর্শক হিসেবে পরিস্থিতি দেখে আসুন। 

এবার ডাক্তাররা যা করেছেন, তাতে তাদের ধন্যবাদ, অভিনন্দন, স্যালুট জানিয়ে হবে না। হৃদয়ের গভীর থেকে অনেক  ভালোবাসা। সরকার নিশ্চয়ই তাদের প্লট বা গাড়ি দেবে না। তবে আমাদের মতো সাধারণ মানুষের যে ভালোবাসা তারা পেয়েছেন, তা সত্যিই অমূল্য।

ডাক্তারদের বিরুদ্ধে বলার মতো অনেক কিছু আছে। আজ আর কিছু বলবো না। খালি বলবো, ডাক্তারদের মধ্যেও অনেক খারাপ আছে। তারা কোনও অপকর্ম করলে তাদের পাশে দাঁড়াবেন না। পেশার মর্যাদা রক্ষার স্বার্থে আপনারাই তাদের প্রতিরোধ করুন। 

আমরা না বুঝে অনেক কথা বলি, লিখি; সব কথা ধরবেন না। কথায় কথায় প্রতিবাদ করে আপনাদের ফোকাস নষ্ট করবেন না। আপনারা সুপার হিরো, আপনাদের আমরা মাথায় করে রাখবো। কথায় কথায় ঝগড়া বাধিয়ে নিজেদের আমাদের মতো সাধারণের কাতারে নামিয়ে আনবেন না।

লেখক: হেড অব নিউজ, এটিএন নিউজ

 

আপনার মন্তব্য