আজ শনিবার, ২৭ ফেব্রুয়ারী, ২০২১

এসআই রোকন ইয়াবাসহ ফের গ্রেফতার

 প্রকাশিত: ২০২১-০১-২১ ১৬:০১:০১

সিলেটে ইয়াবাসহ গ্রেফতার বরখাস্তকৃত এস আই রোকন উদ্দিন ভুঁইয়ার বেপরোয়া আচরণে খোদ পুলিশ বিভাগও ছিল অতিষ্ঠ। কর্মজীবনে ৭১ বারের পুরস্কারপ্রাপ্ত সাবেক এ পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে রয়েছে ১টি গুরুদন্ড এবং ২৮টি লঘুদন্ডের অপরাধ। দুর্নামের কারণে ২০১৮ সালে তাকে সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশ (এসএমপি) থেকে এপিবিএন(আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন)-এ বদলি করা হয়। ২০১৯ সালের জানুয়ারিতে বাসা ভাড়া নিয়ে কিশোরী মেয়েদের পতিতা বৃত্তিতে বাধ্য করা এবং ইয়াবা ব্যবসার সাথে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে র‌্যাব-৯ তাকে গ্রেফতার করে। আদালত থেকে জামিনে বেরিয়ে সে ফের তার পুরনো অপকর্মে জড়িয়ে পড়ে। এরপর গত সোমবার রাতে পুনরায় ইয়াবাসহ গ্রেফতার হয় রোকন। বর্তমানে সে তার কথিত স্ত্রী ও তিন সহযোগীসহ জেল হাজতে রয়েছে।
রোকনের বিরুদ্ধে যত অভিযোগ
এপিবিএন-এ দায়িত্ব পালনকারী জনৈক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, কর্মকালে রোকনের একটি গুরুদন্ড এবং ২৮টি লঘুদন্ড হয়। মাদকে জড়ানোর আগে কর্মদক্ষতার জন্য তিনি ৭১টি পুরস্কারেও ভূষিত হন। কর্মদক্ষতার কারণে তাকে কনস্টেবল থেকে এস আই পদেও পদোন্নতি দেয়া হয়।
২০১৯ সালে র‌্যাবের হাতে গ্রেফতার হওয়ার পর তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। তখন এপিবিএন-এর পক্ষ থেকে তিন সদস্যবিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির প্রধান ছিলেন ৭, এপিবিএন-এর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জয়নাল আবেদীন। তদন্ত কমিটি বিষয়টি তদন্ত করে এপিবিএন-এর অধিনায়কের কাছে রিপোর্ট দাখিল করে। আনীত অভিযোগের সত্যতা পেয়ে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা দায়েরের সুপারিশ করে তদন্ত কমিটি। এপিবিএন সূত্র জানায়, ২০১৮ সালের এপ্রিলে এস আই রোকনকে এসএমপি থেকে এপিবিএন-এ সংযুক্ত করা হয়। ২০১৯ সালে গ্রেফতারের দিনও এস আই রোকন মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর পরিচালিত একটি অভিযানে অংশ নেন বলে পুলিশের একটি সূত্র জানায়।
পুলিশের অপর একটি সূত্র জানায়, বরখাস্ত হওয়ায় রোকন এখন পুলিশের কেউ নন। কাজেই, তাকে নিয়ে পুলিশের কোন মাথা ব্যথা নেই। ৭ এপিবিএন-এর অধিনায়ক ইসরাইল হাওলাদার অসুস্থ থাকায় এ বিষয়ে তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
রোকনকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার ব্যর্থ চেষ্টা
রোকন নেশায় আসক্ত-এটা পুলিশ বিভাগের অনেকেরই জানা ছিল। মূলত নেশার টাকা সংগ্রহের জন্য রোকন অপরাধ কর্মে জড়িয়ে পড়ে বলে ধারণা অনেক পুলিশ সদস্যের। সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের এসপি পদমর্যাদায় কর্মরত সাবেক এক পুলিশ কর্মকর্তা জানান, ২০১৬ সালে এসএমপি’র মোগলাবাজার থানায় দায়িত্ব পালনের সময় পুলিশ বিভাগের পক্ষ থেকে তাকে কাউন্সেলিং করা হয়। এরপর তার নেতৃত্বে একটি ফুটবল টিমও গঠন করা হয়। কিছুদিন সে ভালোও হয়ে গিয়েছিল। এরপর ওই কর্মকর্তা জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে চলে গেলে সে আবার পুরনো পথে ফিরে যায় বলে জানান ওই পুলিশ কর্মকর্তা।
১৯৯৮ সালে চাকুরিতে যোগদান, অত:পর …
রোকনের পৈতৃক বাড়ি কুমিল্লা জেলায় হলেও তার বাবা মৃত আব্দুর রশিদ সিলেটে পুলিশের কনস্টেবল পদে কর্মরত ছিলেন। এ সুবাদে নগরীর মুন্সিপাড়ায় তার বাবা স্থায়ী নিবাস গড়ে তুলেন ( ভুইয়া ভিলা, বাসা নম্বর-৪৫)।
আলাপকালে তার কয়েকজন সহপাঠী জানান, রোকন ১৯৯৬ সালে নগরীর পুলিশ লাইন্স উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাস করেন। কলেজে অধ্যয়নরত অবস্থায় ১৯৯৮ সালে তিনি পুলিশের কনস্টেবল পদে চাকুরি নেন। চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি)-এর মাধ্যমে তিনি কর্মজীবন শুরু করেন। এরপর তিনি সুনামগঞ্জ ও মৌলভীবাজার জেলায়ও দায়িত্ব পালন করেন। সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশেও দু’বছরের মেয়াদে তিনি ‘টাইগার রোকন’ হিসাবে খ্যাতি অর্জন করেন। এ সময় নগরীর অপরাধ দমনে পুলিশের পক্ষ থেকে টাইগার বাহিনী গঠন করা হলে এর সদস্য হিসাবে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন তিনি । এরপর থেকে তার আচরণে পরিবর্তন ঘটতে থাকে। নারী ঘটিত ও মাদক সংক্রান্ত নানা অপরাধে নিজেকে জড়িয়ে ফেলেন। দুর্নামের কারণে তাকে বদলি করা হয় এসএমপি থেকে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক পুলিশ সদস্য জানান, সুদর্শন ও আকর্ষণীয় চেহারার অধিকারী রোকন চট্টগ্রামে চাকুরিরত অবস্থায় পুলিশের জনৈক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার এক নিকটাত্মীয়কে বিয়ে করেন। তার পরিবার বর্তমানে মুন্সিপাড়ার বাসায় বসবাস করছেন। তার দুটি কন্যা সন্তান রয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা ও তার একাধিক সহপাঠী জানান, রোকন নিজের পরিবারকে খুব কম সময় দিতেন। পরিবারের সাথে তার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়নি। তবে, রোকন সব সময় নিজেকে আড়াল করার চেষ্টা করতেন। তিনি সব সময় মাথায় ক্যাপ পরতেন কিংবা তার মাফলার পরিহিত থাকতো-যাতে কেউ তাকে সহজে চিনতে না পারে।
নম্বরবিহীন মোটরসাইকেল চালাতেন রোকন
এস আই রোকন নম্বরবিহীন মোটর সাইকেল চালাতেন। ২০১৯ সালে দাঁড়িয়াপাড়ার যে বাসা থেকে রোকন গ্রেফতার হন, সেই বাসার পার্কিং গ্রাউন্ডে এস আই রোকনের একটি মোটরসাইকেল ছিল। হিরো এক্সট্রিম ব্র্যান্ডের এ মোটর সাইকেলেকোন নম্বর প্লেইট ছিল না। ওই বাসায় উঠার সময় ভাড়াটে ফরমও পূরণ করেননি তিনি।
রোকনের বিরুদ্ধে তিনটি মামলা
গোপন সংবাদের ভিত্তিতে গত সোমবার বিকাল সোয়া ৪টায় সিলেট নগরীর সুবিদবাজারের চন্দ্রিমা আবাসিক এলাকার ব্লক-এ’র ৩নং খান মঞ্জিলে কোতোয়ালী থানার সহকারী কমিশনার মো. সামসুদ্দিন সালেহ আহমেদ ও ওসি এসএম আবু ফরহাদের নেতৃত্বে অভিযান চালানো হয়। অভিযানকালে বরখাস্ত এস আই রোকন, তার কথিত স্ত্রী রিমাসহ ৫ জনকে গ্রেফতার করা হয়। তাদের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয় ১৮৫ পিস ইয়াবা ও নগদ ৮২ হাজার ৩০০ টাকা। এ ব্যাপারে কোতয়ালী থানার এস আই ফায়াজ উদ্দিন ফয়েজ বাদী হয়ে মাদক আইনে তাদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছেন। এছাড়া, ২০১৯ সালের ২৬ জানুয়ারি দিবাগত রাতে শিশুদের আটকে রেখে জোরপূর্বক পতিতাবৃত্তিতে বাধ্য করা এবং ইয়াবা বিক্রির অভিযোগে সিলেট নগরীর দাড়িয়াপাড়া এলাকার একটি বাসা থেকে ভুয়া স্ত্রীসহ এস আই রোকন উদ্দিনকে আটক করে র‌্যাব। অভিযানের সময় ওই বাসা থেকে ১২ ও ১৩ বছর বয়সের দুই শিশু ভিকটিমকে উদ্ধার করা হয়। এ সময় রোকন ও রিমার কাছ থেকে নীল রংয়ের ৩৭ পিস ও গোলাপী রংয়ের ২৩ পিস ইয়াবা ট্যাবলেট, নগদ সর্বমোট ১ লাখ ৩৭ হাজার ৪২২ টাকা জব্দ করা হয়।
এ ঘটনায় গ্রেফতার বরখাস্তকৃত পুলিশের এস আই রোকন উদ্দিন ভুইয়া ও তার ভুয়া স্ত্রী রিমা বেগমের বিরুদ্ধে পৃথক দুটি মামলা দায়ের করা হয়। সিলেট সিটি কপোরেশন ২নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর বিক্রম কর সম্রাট বাদী হয়ে ২০১২ সালের মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইন (ধারা ৮/১১/১২/১৩); ‘পতিতাবৃত্তি বৃত্তির উদ্দেশ্যে ভাড়া বাসা লইয়া পতিতালয় হিসাবে ব্যবহার করিয়া পতিতাবৃত্তি, যৌন শোষণ ও নিপীড়নের জন্য আমদানি বা হস্তান্তর করত: অপরাধ সংঘটনের প্ররোচণা চালানোর অপরাধে’ কোতয়ালী থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। এছাড়া, র‌্যাব-৯’র এসআই (নি:) মো: সাইদুল ইসলাম বাদী হয়ে ২০১৮ সালের মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের ৩৬ (১ ) ও ১০(ক) ধারায় আরেকটি মামলা দায়ের করেন।
কোতয়ালীর ওসি যা বলেন
কোতয়ালী থানার ওসি এসএম আবু ফরহাদ জানান, বরখাস্ত কৃত এস আই রোকনের অপরাধ জগতের তথ্য বের করতে তাকে রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।

আপনার মন্তব্য