আজ শনিবার, ২৮ নভেম্বর, ২০২০

বঙ্গদেশে করোনা: প্রাপ্তি ও সম্ভাবনা

২১ ঘন্টায় কেউ এগিয়ে না আসা সন্তানের লাশের পাশে মায়ের আহাজারি

 প্রকাশিত: ২০২০-০৪-১৫ ২১:৪৯:৫৩

মিজান মুন্না:

সুনামগঞ্জে করোনা উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুবরণ করেন একজন। যারে আতংকে খাটিয়া পর্যন্ত দেয় নি গ্রামবাসী! লাশ কাধে নিয়েই গোরস্তানে যায় তিন ভাই! 

 

নরসিংদীতে নারায়ণগঞ্জ থেকে যাওয়া এক বোন করোনা উপসর্গে মরার পর লাশ নৌকায় রেখে দিছে মাটি দিতে দিচ্ছে না এলাকার লোকজন। মেয়েটা অন্তঃসত্ত্বা ছিল। 

 

১৬ ঘন্টা ৬ টি হাসপাতাল ঘুরে অবশেষে বিনা চিকিৎসায় মৃত্যু!

 

করোনা আতংকে মাকে জঙ্গলে ফেলে রেখে সন্তানরা উধাও!

 

 "প্রবাসীদের প্রবেশ নিষেধ" সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে দিয়েছে ফুলকলি, টং চায়ের দোকান ও সেলুন।

 

অসুস্থ মেয়েকে করোনার ভয়ে বাপের বাসা থেকে বের করে দিছে এলাকার লোক!

এগুলো মধ্য মার্চ থেকে মধ্য এপ্রিল পর্যন্ত মাত্র এক মাসে দেশে ঘটে যাওয়া অনেকগুলো ঘটনার মাঝে কিছু প্রকাশিত অপ্রত্যাশিত ঘটনা। যে খবরগুলোর সাথে দাহ্য হয়ে গেছে সব মানবতা, মমত্ববোধ, ভ্রাতৃত্ব, ব্যবস্থাপনা, প্রশাসন, সরকার, সিষ্টেম ও সুশীলতা আর এর পিছনে আড়াল হয়ে গেছে অনেক মানবিক ঘটনাসমূহ। যেমন- ব্যাক্তি উদ্দ্যোগে বিভিন্ন জায়গায় অসহায় মানুষের মাঝে খাদ্য সামগ্রী বিতরণ, এলাকার অসহায় মানুষের ঘরে ঘরে ডিসির চাল বহন করা, মানুষকে সচেতন করতে পুলিশ-বিশেষ বাহিনীর দিন রাত ছুটাছুটি, অপর্যাপ্ত পিপিই থাকা সত্বেও জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ডাক্তারদের সেবা কার্যক্রম ইত্যাদি।

 

আমরা যদি এভাবে চিন্তা করি...

এই যে মাকে জঙ্গলে ফেলে আসা সন্তানগুলো, চাল চুরি করা চেয়ারম্যানগুলি, লাশেরে খাটিয়া না দেয়া এলাকাবাসী, মৃতদেহ নৌকায় রেখে দিতে বাধ্য করা লোকজনগুলো, ব্যর্থ কর্তৃপক্ষ, দেশের চালিকা শক্তি প্রবাসীদের চরম অবহেলা, মহামারীতে মুনাফা খোজা অমানুষগুলো মানুষ হিসেবেই মারা যেত এই করোনা না এলে। অমানুষের সাথে এই পরিচয়ই প্রাপ্তি। 

 

এই যে সভ্য দেশের, সভ্য জীবন যাপনে অভ্যস্ত শিক্ষিত লোকগুলোর সংকীর্ণতা প্রকাশ পেয়ে গেছে জীবন সঙ্গীর সামনে। সামান্য হাঁচি-কাশি  দিলে অবিশ্বাস করছে একে অপরকে! এই ভঙ্গুর বিশ্বাস, অসংগতি অভিনয় প্রকাশই প্রাপ্তি। 

 

এই যে পরাক্রমশালী মোড়লদের পারমাণবিক প্রকল্প আছে কিন্তু লাশের ব্যাগের সংকট! বিশ্বের যেকোনো স্থানে সবচেয়ে কম সময়ে আক্রমণ করার শক্তিশালী দুর্ধর্ষ রিজার্ভ ফোর্স অত্যাধুনিক প্রযুক্তি আর অস্ত্র নিয়ে ব্যারাকেই বসে আছে। এই অসহায়ত্ব অনুধাবনই প্রাপ্তি। 

 

এই যে তোমার বাচার জন্য মহা আয়োজনে মৃত্যুর কোনো ভাবনাই নাই! মৃত্যু- চিরন্তন এই সত্যকে অস্বীকার করে চলছো- কাজে, না বুঝে, পরিকল্পনায়। আমি আমি আমার আমার করে গোগ্রাসে সব গ্রাস করে চলছো! যেন তোমার আর শেষ নাই!! এই বিচ্যুতি বুঝাই প্রাপ্তি।।

 

উপরোক্ত উপলব্ধি থেকে আমরা স্বপ্ন দেখতে পারি করোনাউত্তোর এক নতুন পৃথিবীর, যেখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার স্থানে মনুষ্যত্ব জায়গা করে নেবে। চুর্ণ বিচুর্ণ হবে দম্ভ। বিলোপ হবে লোভ, স্বার্থপরতা আর হিংসার। পারমাণবিক প্রকল্পগুলো ফুলের বাগানে পরিণত হবে, সামরিক চুক্তির পরিবর্তে হবে চিকিৎসা চুক্তি, সাবমেরিনগুলো হবে প্রমোদ তরী, যুদ্ধবিমানগুলো হবে এয়ার এ্যাম্বুলেন্স, রাসায়নিক অস্ত্র গবেষণাগারে জোনাকির নীল আলো আর হলুদ আলো বানানোর গবেষণা হবে। গবেষণা হবে প্রজাপতির আয়ূ বাড়ানোর, দিনে ঘ্রান দেয়া জাত উদ্ভাবিত হবে হাসনাহেনার। প্রযুক্তি বাদ দিয়ে সরাসরি গল্প করা যাবে অনেকক্ষণ যেন কোন তাড়া নেই। 

হেরে যাওয়া আর মরে যাওয়া দিয়ে এই সত্য প্রতিষ্ঠিত হবে- জীবন এতো জটিল করে কী লাভ, যেহেতু অমর হওয়ার সুযোগ নেই।

আপনার মন্তব্য