আজ মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই, ২০২০

তিন ঘণ্টায় ওদের সব শেষ

 প্রকাশিত: ২০২০-০৩-১২ ১৮:৫৭:৫৯

রূপনগর বস্তিতে ঢোকার আগে রাস্তার দু’পাশে নিঃস্ব মানুষের ভিড়। আগুন তাদের নিঃস্ব করে দিয়েছে।  ভস্মীভূত করেছে ঘরের সম্পদ। সেখানে অনেককে  ঘরের মালামাল নিয়ে বসে থাকতে দেখা গেছে। অগ্নিকাণ্ড থেকে অল্প-স্বল্প রক্ষা করতে পেরেছেন তারা। প্রথম দেখায় যে কারো মনে হবে এটি একটি শরণার্থী শিবির। কেউ সদ্য বিবাহিত, কেউ আবার বয়সের ভারে নুয়ে পড়েছেন। শিশুরা খাবার পানির জন্য কাঁদছিলেন। পাশের একটি ফুসকার দোকান থেকে পানি এনে শিশুকে পান করাতে দেখা যায় এক মা’কে।
এরমধ্যে উদাস দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতে দেখা যায় হালিমা নামে এক সর্বস্ব হারানো নারীকে। মিরপুরের একটি বাসায় কাজ করেন হালিমা। সকাল সাড়ে ১০ টায় ঘর মোছার কাজ করছিলেন তিনি। এমন সময় গৃহকর্তী এসে বলেন, হালিমা তোমাদের বস্তিতে ধোয়ার কুণ্ডলি দেখা যাচ্ছে। দ্রুত বাসায় চলে যাও। হালিমা বলেন, ম্যাডামের কথা শুনে আমি এক দৌড়ে বস্তিতে চলে আসি। দেখি ততক্ষণে সব পুড়ে ছাই। আমার স্বামী একটি স্কুলের ভ্যান চালায়। একটি মেয়ে ছিল কয়েক মাস আগে মারা গেছে। এখন শেষ সম্বলটুকুও হারালাম। গত মাসের বেতনের টাকাসহ নিজের জমানো প্রায় ১১ হাজার টাকা ছিল ঘরে। ঘরের অন্যান্য জিনিসপত্রের সঙ্গে টাকাগুলোও পুড়ে ছাই হয়েছে।

বস্তির পাশের ঈদগাহঁ মাঠের এক কোনে বসে ভাত খাচ্ছিলেন সুমনা। কোলে তার সাত দিন বয়সি সন্তান। সুমনা বলেন, ছেলে সোহেল জন্মের পর থেকে ঘনঘন ক্ষুধা লাগে। সকাল থেকে কিছুই খাইনি। খাবো কিভাবে। আগুন লাগার খবর পেয়ে দুই ছেলে-মেয়েকে নিয়ে ঈদগাহ মাঠে চলে আসি। পড়নের কাপড় ছাড়া আর কিছুই আনতে পারিনি। ওর আব্বা সকালে কাজে গেছে। সে এসে বাসার কিছুই বের করতে পারেনি। এখন কোথায় যাবো কি করবো কিছুই জানি না।

মিরপুরের রূপনগর বস্তিতে প্রায় সহাস্রাধিক ঘর পুড়ে ভস্মীভূত হয়েছে। গতকাল সকাল পৌনে ১০টার দিকে লাগা আগুন প্রায় পৌনে ৩ ঘণ্টার চেষ্টায় নিয়ন্ত্রণে আসে। মুহূর্তেই আগুন ভয়াবহ রূপ নেয়। পুরো বস্তিতে আগুন ছড়িয়ে পড়ে। পরবর্তীতে ফায়ার সার্ভিসের ২৫টি ইউনিট দুপুর ১টার দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি দেরিতে এসেছে অভিযোগ করে শুরুতে ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি লক্ষ্য করে ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করে বিক্ষুব্ধ বস্তিবাসী। পরে পুলিশের সহযোগিতায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনে আসে।

বস্তিতে হাসিনা বেগমের প্রায় ২২টি ঘর পুড়েছে। একটি স্টিলের আলমীরা আর টেলিভিশন ছাড়া কিছুই বের করতে পারেননি। হাসিনা বলেন, স্বামী আর তিন ছেলে-মেয়েকে নিয়ে প্রায় একযুগ ধরে রুপনগর বস্তিতে থাকি। এরকম ভয়াবহ আগুন আর কখনো দেখিনি। আড়াই মাস আগে একবার আগুন লেগেছিল। তাতে খুব একটি ক্ষয়-ক্ষতি হয়নি। কিন্তু এবারের আগুনে সব চোখের সামনে পুড়ে ছাই হয়েছে। ঘরে খাট, ফ্রিজ, ফ্যান, নগদ টাকা, মাসের বাজার কিছুই আনতে পারিনি।     হাসিনা-হালিমার মতো এমন অনেক বস্তিবাসী আগুনে পোড়া ধ্বংস্তুপে এখন শেষ সম্বলটুকু খুঁজে চলেছেন।

বস্তিতে বেশিরভাগ ভ্যানচালক, রিকশাচালক, দিনমজুর, পোশাক কারখানার কর্মীদের মতো নিম্ন আয়ের মানুষ থাকেন। অগ্নিকাণ্ডের সময় অনেকেই কর্মস্থলে ছিলেন। ফলে অধিকাংশ লোকই ঘরের মালামাল বের করতে পারেননি। তারা এখন কোথায় যাবেন, কী করবেন কিছুই বুঝে উঠতে পারছেন না।

স্থানীয় সংসদ সদস্য ইলিয়াস উদ্দিন মোল্লা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। এসময় তিনি বলেন, তাদের পুনর্বাসন না হওয়া পর্যন্ত আশ্রয়কেন্দ্রে রাখা হবে। আশেপাশের স্কুলগুলোতে থাকা ও খাবার ব্যবস্থা করা হবে। অবৈধ গ্যাস লাইন থেকেই আগুনের সূত্রপাত হয়েছে কি না এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, অভিযোগ পেলে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেয়া হবে।

ঘটনাস্থলে থাকা ফায়ার সার্ভিসের পরিচালক (অপারেশন) লে. কর্নেল জিল্লুর রহমান বলেন, আগুনের খবর পাওয়ার পর পর্যায়ক্রমে আমাদের ২৫টি ইউনিট ঘটনাস্থলে আসে। আগুন নিয়ন্ত্রণে রাজধানীর তেজগাঁও, মোহাম্মদপুর, মিরপুর, উত্তরা, তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল এবং হেড কোয়ার্টার থেকে ফায়ার সার্ভিসের ইউনিটগুলো কাজ করে। প্রাথমিকভাবে শর্ট সার্কিট থেকে আগুন লেগেছে বলে ধারণা করেন ফায়ার সার্ভিসের পরিচালক।
পুরো বস্তিতে প্লাস্টিকের পাইপে গ্যাস লাইনের সংযোগ ছিল উল্লেখ করে তিনি বলেন, আগুন লাগার পর বস্তিবাসী বিভিন্ন আসবাব রেখে রাস্তা বন্ধ করে রাখে। ফলে গাড়ি ঢুকতে বাধাপ্রাপ্ত হয়। পানির সংকট আর বাতাসের তীব্রতার কারণে বস্তিতে লাগা আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে। ফলে আগুন নিয়ন্ত্রণে বেগ পেতে হয়েছে। আশে-পাশের বিভিন্ন ভবনের রিজার্ভ ট্যাংকি থেকে পানি নিয়ে আমরা কাজ করেছি। এছাড়া ফাঁকা জায়গায় তীব্র বাতাস থাকায় আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে। বস্তিবাসী আমাদের গাড়ি ঢুকতে বাধা দেয়। তারা ফায়ার সার্ভিস কর্মী ও গাড়িতে হামলা করে। পরবর্তীতে প্রশাসনের সহায়তায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে বলে জানান তিনি।

আপনার মন্তব্য