আজ সোমবার, ৩০ মার্চ, ২০২০

দুই মেয়েকে হত্যার পর মায়ের আত্মহত্যার চেষ্টা

 প্রকাশিত: ২০২০-০৩-০৮ ১১:৩৫:০০

রাজধানীর খিলগাঁও এলাকার একটি বাসা থেকে দুই কন্যা শিশুর গলাকাটা লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। তারা হলো: মেহজাবিন আলভি (১১) ও জান্নাতুল ফেরদৌসি জান্নাত (৬)। ওই বাসা থেকে  দগ্ধ অবস্থায় নিহতদের মা আকতারুন্নেসা পপিকে (৩৫) উদ্ধার করা হয়। আলভি খিলগাঁও ন্যাশনাল আইডিয়াল স্কুলে চতুর্থ শ্রেণীতে এবং জান্নাত প্রথম শ্রেণীতে পড়তেন। পুলিশ ও পরিবারের ভাষ্য, পপি তার দুই মেয়েকে হত্যার পর নিজে গায়ে আগুন দিয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা চালান।
পারিবারিক কলহ ও আর্থিক লেনদেনের ক্ষোভ থেকে পপি এ ঘটনা ঘটিয়েছে। পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে একটি রক্তমাখা ছুরি ও একটি বটি উদ্ধার করেছে। পপির সঙ্গে তার স্বামী মোজাম্মেল হক বিপ্লবের দীর্ঘদিন ধরে নানা বিষয়ে বিরোধ চলে আসছিল।

পপি সন্তানদের নিয়ে ঢাকার খিলগাঁওয়ের দক্ষিণ গোড়ান এলাকায় থাকতেন। আর তার স্বামী ইলেকট্রিক ব্যবসার সূত্রে মুন্সিগঞ্জের শ্রীনগরে থাকতেন।
পারিবারিক ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, গতকাল সকাল ৭ টার দিকে খিলগাঁও থানা পুলিশ ট্রিপল নাইনে ফোন পেয়ে দক্ষিণ গোড়ানের মোল্লা ভবনের ৩৮৯, নম্বর বাসার চতুর্থ তলার একটি ফ্ল্যাট থেকে দুই শিশুর গলাকাটা লাশ উদ্ধার করে। এসময় তার মাকে দগ্ধ অবস্থায় উদ্ধার করে ঢামেক হাসপাতালের বার্ণ ইউনিটে ভর্তি করেন। পপির শরীরের ১৮ শতাংশ পুড়ে গেছে।

চিকিৎসকরা বলছেন, পপির গলার শ্বাসনালী ক্ষতিগ্রস্থ না হওয়ায় অনেকটা ঝুঁকিমুক্ত রয়েছেন। ঢামেক হাসপাতালের বার্ণ ইউনিটে চিকিৎসাধীন পপি মানবজমিনকে জানান, ৯ বছর আগে বিপ্লবের সঙ্গে তার পারিবারিকভাবে বিয়ে হয়। পপির স্বামীর বাড়ি মুন্সিগঞ্জের শ্রীনগর এলাকায়। আর তার বাড়ি একই জেলার সিরাজদিখান এলাকায়। তবে পূর্ব গোড়ান এলাকায় তার বাবার নিজের বাড়ি আছে। বিয়ের ৯ বছরের মধ্যে ৭ বছরই বাবার বাড়িতে তিনি বসবাস করেছেন। গত ২ বছর আগে দক্ষিণ গোড়ানের ৩৮৯ নম্বর বাসাটি তার স্বামী ভাড়া নিয়ে দিয়েছিলেন। ওই বাসায় তিনি তার দুই সন্তানকে নিয়ে থাকতেন।
তিনি আরও বলেন, তার স্বামী ব্যবসার সূত্রে গ্রামে থাকতেন। সপ্তাহে একদিন আসতেন। তাকে ভরণ পোষণ দিতেন না। বিপ্লব তাকে মাঝে মাঝে মারধর করতেন। স্বামীর চাপ ছিল যে, তিনি এবং দুই সন্তান যেন মুন্সিগঞ্জে চলে যান। কিন্তু, মেয়েদের ঢাকায় পড়ার স্বার্থে তিনি সেখানে যাননি। তার স্বামী তাকে প্রত্যেক মাসে ১১০০ টাকা দিতো।
তিনি আরও জানান, সন্তানের লেখাপড়া করাতে পারছিলাম না। সংসার চালানো যাচ্ছিল না। স্বামী সংসার খরচ দিত মাত্র ১ হাজার ১০০ টাকা। ওই টাকায় কিছুই করা যাচ্ছিল না। প্রত্যেক বৃহস্পতিবার রাতে তার স্বামী গ্রাম থেকে ঢাকায় আসেন। আবার শনিবার ভোরে চলে যান।
গতকাল দুপুরে দক্ষিণ গোড়ানের ওই বাসায় গিয়ে দেখা যায়, বাসার নিচে দুই পুলিশ সদস্য প্রহরা দিচ্ছেন। বাসার আশপাশে লোকজনের ভিড়। সিআইডির ক্রাইম সিনের সদস্যরা বাসা থেকে বিভিন্ন আলামত জব্দ করাতে ব্যস্ত ছিলেন। দুই কন্যা শিশুর এমন মৃত্যুতে এলাকাবাসী অনেকটা হতবাক। ওই বাসায় মোট ২৪ টি ফ্ল্যাট রয়েছে। চতুর্থ তলার বামপাশের ফ্ল্যাটে দুই কন্যা সন্তানকে নিয়ে থাকতেন পপি।
ফ্ল্যাটের লোকজন জানালেন যে, পপি ওই বাসায় থাকলেও কারও সঙ্গে তেমন কোন সম্পর্ক ছিল না। শুধু বাচ্চাদের স্কুলে যাতায়াতের সময় তাকে দেখতেন তারা। আর সপ্তাহে একদিন তার বাসায় মুন্সিগঞ্জের শ্রীনগর থেকে তার স্বামী আসতেন।
ওই বাড়ির বাসিন্দা আকলেমা বেগম জানান, এই পরিবারের  লোকজন অন্যদের সঙ্গে তেমন  মেলামেশা করতেন না। দগ্ধ পপি পর্দানশীল ছিলেন। তিনি মেয়েদের স্কুলে আনা নেয়া করতেন। প্রায়ই বাচ্চাদের মারধর করতেন তিনি। বাইরে থেকে তা বোঝা যেত।
তিনি আরও জানান, আজ সকালে পপির বাবা খুব জোরে বাইরে থেকে দরজা খোলার জন্য ধাক্কা দিচ্ছিলেন। কিন্তু, দরজা খোলা হচ্ছিল না। পরে আমরাও যাই। এ সময় ভেতর থেকে দরজা খুলে দেয়া হয়। আমরা ভেতরে গিয়ে সন্তানের লাশ দেখতে পাই।

এসময় দগ্ধ অবস্থায় পপি কাতরাচ্ছিলেন। তখন পপির বাবা কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন। মাহবুব নামে আরেক বাসিন্দা জানান, ঘটনাটি জানাজানি হলে এলাকার লোকজন বাড়িতে ভিড় করেন।
পপির ভাই অনীক জানান, বিয়ের পর থেকেই তার বোনের সংসারে বিরোধ চলছিল। অনেকবার ডির্ভোসের উদ্যোগ নেয়া হলোও দুই বাচ্চার মুখের দিকে তাকিয়ে আমরা আর বেশি দূর এগোইনি। বিপ্লব কোন খরচপাতি দিতেন না। এছাড়াও বিপ্লব তার বোনকে ১০ লাখ টাক যৌতুকের জন্য চাপ দিয়ে আসছিলো।
তিনি আরও জানান, তার বাবার ওই টাকা দেয়ার সামর্থ ছিল না। টাকার জন্য স্বামীর অত্যাচার, অপর দিকে দুই সন্তানের লেখাপড়া এবং ভবিষ্যত নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়েন পপি। এতে তার বোন  মানসিকভাবে ভেঙ্গে পড়েছিলেন।
পপির বাবা আবু তালেব কান্না জড়িত কন্ঠে জানান, ঘটনাটি রাত ১২ টার দিকে হয়েছে। এরপর তার মেয়ে ঘরে বসে ছিলেন। পপি মধ্যরাতে তাকে ফোন দিয়ে বলেন যে, তিনি  যেন সকালে আসেন। তখন তিনি আসার কারণ বলেননি।
খিলগাঁও থানার ওসি মশিউর রহমান জানান, খুনের বিষয়টি প্রাথমিকভাবে পপি পুলিশের কাছে স্বীকার করেছে। পারিবারিক কলহ থেকে এ ঘটনা ঘটেছে। আমরা বিষয়টি তদন্ত করে দেখছি। থানায় অভিযোগের ভিত্তিতে মামলা দায়ের হবে। ঘটনার জন্য প্রাথমিকভাবে অভিযুক্ত পপি খিলগাঁও থানা পুলিশের প্রহরায় ঢামেক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন।

আপনার মন্তব্য