আজ মঙ্গলবার, ২৮ জানুয়ারী, ২০২০

জেনারেল কাসেম সোলাইমানি হত্যার বদলা নেয়ার লাখো মানুষের ঢল প্রতিশোধের ডাক

 প্রকাশিত: ২০২০-০১-০৬ ১১:৪৬:২০

জেনারেল কাসেম সোলাইমানি হত্যার বদলা নেয়ার ডাক দিয়েছেন ইরাক ও ইরানের সাধারণ জনগণ। শনি ও রোববার তার প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে দু’দেশেই নেমেছিলো লাখো জনতার ঢল।

দেশ দুটির শহর ও গ্রামে নেমে এসেছে গাঢ় শোকের ছায়া। ইরানে ঘোষণা করা হয়েছে তিনদিনের রাষ্ট্রীয় শোক। রোববার খুব সকালে ইরানের আল কুদ্‌স ব্রিগেডের প্রধান মেজর জেনারেল কাসেম সোলাইমানির মৃতদেহ ইরাক থেকে দেশে পাঠানো হয়। জাতীয় পতাকায় আবৃত তার মরদেহ আকাশপথে নিয়ে যাওয়া হয় ইরানের দক্ষিণ-পশ্চিমের খুজিস্তান প্রদেশের প্রধান শহর আহভাজে।
সেখানে তার মৃতদেহ পৌঁছালে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়। বিমান থেকে যখন তার মৃতদেহ নামানো হচ্ছিল তখন বিউগলে সেনাবাহিনীর করুণ সুর বাজানো হচ্ছিল।

 

রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে সরাসরি দেখানো হয়, আহভাজে কালো পোশাক পরে শোকর‌্যালি করছেন লাখো মানুষ। বুক চাপড়ে হাউমাউ করে কাঁদতে দেখা যায় তাদেরকে। রাস্তায় নেমে আসে জনস্রোত থেকে জোর গলায় উচ্চারিত হতে থাকে প্রতিশোধের ডাক। আহভাজ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে উপস্থিত ছিলেন ইরানের শীর্ষস্থানীয় সামরিক বাহিনীর কর্মকর্তারা। আহভাজ থেকে সোলাইমানির লাশ নিয়ে যাওয়ার কথা রয়েছে মাশহাদ শহরে। সোমবার রাজধানী তেহরানে তার জানাজা অনুষ্ঠিত হবে।

এ উপলক্ষে সেখানে ছুটির দিন ঘোষণা করা হয়েছে। এর আগে শনিবার ইরাকেও সোলাইমানিকে বিদায় দিতে বাগদাদে নামে মানুষের ঢল। এদিন কালো পোশাক পরে এবং শক্তিশালী আধা-সামরিক গ্রুপ হাশদ আল-শাবীর পতাকা উত্তোলন করে দলে দলে মানুষ জড়ো হতে শুরু করে। মৃতদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে প্রথমে জনতা বাগদাদের কাদিমিয়ার শিয়া মাজারের কাছে জড়ো হয়। শুক্রবার ভোরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের আদেশে বিমান হামলায় বাগদাদের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কাছে ইরানের অভিজাত ইসলামিক রেভ্যুলুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)-এর কুদ্‌স ফোর্সের প্রধান এবং এর আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারের মাস্টারমাইন্ড সোলাইমানি নিহত হন। এই হামলায় শীর্ষ ইরাকি পিএমএফ কমান্ডার আবু মাহদী আল-মুহান্দিস ও সোলাইমানির উপদেষ্টাও মারা গেছেন।

নিজেকে পিএমএফের সদস্য হিসেবে দাবি করে ৩৪ বছর বয়সী আমজাদ হামউদ আল জাজিরাকে বলেছেন, আমরা এই সাহসী যোদ্ধা সোলাইমানি এবং মুহানদিসের মৃত্যুতে শোক জানাতে এসেছি। তিনি আরো যোগ করেন, দু’জনই শিয়া বিশ্ব ও ইরাকের স্বার্থে নিজের জীবন উৎসর্গ করেছেন। শোক প্রকাশকারীরা, যাদের বেশির ভাগই পিএমএফের সমর্থক, তারা গ্রিন জোনে গিয়েছিলেন মিছিল নিয়ে। সেখানে মার্কিন দূতাবাস সহ সরকারি অফিস এবং বিদেশি দূতাবাসগুলো অবস্থিত।
সোলাইমানির মরদেহ জনতার কাছে পৌঁছালে সমাবেশ থেকে স্লোগান দেয়া শুরু হয়। বলা হয়, আপনি কখনো আমাদের অবনত হতে দেননি। ইরাকের প্রধানমন্ত্রী আদেল আবদুল মাহদী অক্টোবরের গোড়ার দিকে শুরু হওয়া সরকারবিরোধী বিক্ষোভের পড়ে নভেম্বরে পদত্যাগ করেছিলেন। তবে শনিবার তিনি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে জানাজার মিছিলে অংশ নেন। এতে তিনি ছাড়াও উপস্থিত ছিলেন, দেশটির সাবেক প্রধানমন্ত্রী নুরি আল-মালিকিসহ একাধিক শক্তিশালী শিয়া নেতা।
পিএমএফের মুখপাত্র মোহননাদ হুসেন ওই জানাজা মিছিলের আয়োজন করেন। তিনি আল জাজিরাকে বলেন যে, কারবালা শহরে শনিবারের শেষ জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। কারবালা হলো ইরাকের শীর্ষ শিয়া নেতা গ্র্যান্ড আয়াতুল্লাহ আলী আল-সিস্তানির ঘাঁটি। তিনি মার্কিন হামলার নিন্দা করেছেন এবং শুক্রবারের খুতবার জন্য তার দপ্তর থেকে এক বিবৃতিতে সব পক্ষকে সংযম বজায় রাখার আহ্বান জানিয়েছেন। মরদেহগুলোকে পবিত্র নগরী নাজাফে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে আল-মুহানদিসসহ এই হামলায় নিহত অন্য ইরাকিদের দাফন করা হয়েছে। রোববার নিহত ইরানিদের মরদেহ তেহরানে প্রেরণের কথা রয়েছে।
এদিকে, ইরানে চলছে সোলায়মানির সম্মানে তিন দিনের জাতীয় শোক। সোলাইমানিকে বলা হয় ইরানের দ্বিতীয় শক্তিধর ব্যক্তিত্ব। সুপ্রিম নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনি এই হত্যাকাণ্ডের কঠিনতম প্রতিশোধের ঘোষণা দিয়েছেন।

মার্কিন স্বার্থে প্রতিশোধমূলক হামলা চালানোর দাবি জানানো হয়েছে বাগদাদের শনিবারের মিছিল থেকে। শোককারীরা বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরাকি সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন করেছে এবং তাদের যোদ্ধাদের লক্ষ্যবস্তু করেছে। তাই ইরাককে অবশ্যই এ হামলার জবাব দিতে হবে। সমাবেশে ২৪ বছর বয়সী আলি এই হত্যাকাণ্ডকে অত্যন্ত বেদনাদায়ক বলে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, আমরা হাশেদ ও ইরাকি সরকারকে মার্কিন আক্রমণের জবাব দেয়ার আহ্বান জানাচ্ছি।

তিনি আরো যোগ করেন, যদি রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া পর্যাপ্ত না হয় তবে সামরিকভাবে একটি হামলা প্রয়োজন। হুসেন বলেন, আমাদের সকলের জন্য এটি অত্যন্ত দুঃখের দিন। তবে প্রতিটি যোদ্ধা শহীদ হওয়ার জন্য প্রস্তুত। জবাব দিতে প্রয়োজনে আমরা আমাদের নেতাদের মতো জীবন উৎসর্গ করতে চাই। আমরা বলতে চাই, সামরিক বাহিনীর অংশ হিসেবে হাশদ আল-শাবী যা করা দরকার তাই করবে। আমরা লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত।

আপনার মন্তব্য